মানুষের বিকাশ একটি ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। জন্মের পর থেকে বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও প্রাক্ষোভিক বা আবেগীয় পরিবর্তন ঘটে। বিকাশের প্রতিটি পর্যায়ের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
সাধারণভাবে বিকাশের বিভিন্ন স্তরকে নিচের ভাগে আলোচনা করা যায়—
- শৈশবকাল (Infancy)
- বাল্যকাল (Childhood)
- কৈশোরকাল (Adolescence)
- প্রাপ্তবয়স্ককাল (Adulthood)
১. শৈশবকাল (Infancy)
জন্মের পর থেকে প্রায় ৫ বা ৬ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কে শৈশবকাল বলা হয়। শিক্ষার দিক থেকে এই সময়কে সাধারণত প্রাক্-বিদ্যালয় স্তর বলা হয়।
এই সময় শিশুর বিকাশের গতি খুব দ্রুত হয়। শৈশবকালকে আবার দুটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়—
- প্রাক্-শৈশব: জন্ম থেকে ৩ বছর
- প্রান্তীয় শৈশব: ৩ বছর থেকে ৫ বা ৬ বছর
প্রাক্-শৈশব: জন্ম থেকে ৩ বছর
দৈহিক বিকাশ
এই পর্যায়ে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি খুব দ্রুত ঘটে। দেহের বিভিন্ন অঙ্গের আকার বৃদ্ধি পায় এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে সমন্বিতভাবে কাজ করতে শেখে।
শিশুর ইন্দ্রিয়ের বিকাশ ঘটে এবং কর্মেন্দ্রিয়ের প্রাথমিক সমন্বয় তৈরি হয়।
মানসিক বিকাশ
এই সময় শিশুর মধ্যে ধীরে ধীরে আত্মসচেতনতা তৈরি হয়।
জন্মের পর শিশুর ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হল কান্না। পরে ধীরে ধীরে ভাষার বিকাশ ঘটে এবং শিশু শব্দ ব্যবহার করে নিজের ভাব প্রকাশ করতে শেখে।
শিশুর চারপাশের বিভিন্ন বস্তু সম্পর্কে কৌতূহল তৈরি হয়। তবে এই বয়সে শিশুর মনোযোগ সাধারণত অল্প সময়ের জন্য কোনো একটি বস্তুর উপর স্থায়ী হয়।
প্রাক্ষোভিক বা আবেগীয় বিকাশ
প্রায় দুই বছরের মধ্যে শিশুর বিভিন্ন আবেগ আলাদা করে প্রকাশ পেতে শুরু করে। যেমন—
- আনন্দ
- রাগ
- ভয়
- উল্লাস
- ভালোবাসা
পরিবারের সদস্যদের প্রতি শিশুর আবেগীয় প্রতিক্রিয়াও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়।
সামাজিক বিকাশ
শুরুতে শিশু মূলত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেই সামাজিক প্রতিক্রিয়া দেখায়।
এই বয়সে শিশু বেশ আত্মকেন্দ্রিক থাকে। তাই সমবয়সিদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে মানিয়ে চলতে তার অসুবিধা হতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সামাজিক আচরণ ধীরে ধীরে বিকশিত হয়।
প্রান্তীয় শৈশব: ৩ থেকে ৬ বছর
দৈহিক বিকাশ
এই পর্যায়ে শিশুর পেশির বিকাশ দ্রুত হয়। দেহসঞ্চালনের ক্ষমতা বাড়তে থাকে।
শিশু ধীরে ধীরে—
- দৌড়াতে পারে
- লাফাতে পারে
- বল ছুড়তে পারে
- সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারে
- বিভিন্ন জিনিস শক্ত করে ধরতে পারে
অর্থাৎ, শিশুর মোটর বা সঞ্চালনমূলক দক্ষতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
মানসিক বিকাশ
এই সময় শিশুর ভাষা ব্যবহারের ক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। শব্দভান্ডারও অনেক বাড়ে।
প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে শিশু বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে পারে। তার আত্মনির্ভরতা বাড়ে এবং বৌদ্ধিক বিকাশ শুরু হয়।
এই পর্যায়ে—
- কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি পায়
- কৌতূহল বাড়ে
- অনুকরণ করার প্রবণতা দেখা যায়
- নতুন বিষয় জানার আগ্রহ তৈরি হয়
প্রাক্ষোভিক বা আবেগীয় বিকাশ
এই পর্যায়ে শিশুর আবেগ আরও স্পষ্ট হয়। পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আবেগ ধীরে ধীরে পরিবারের বাইরের পরিবেশেও প্রকাশ পেতে শুরু করে।
এই সময়—
- লজ্জা
- আশঙ্কা
- ঘৃণা
- ভালোবাসা
ইত্যাদি অনুভূতির বিকাশ ঘটে।
সহপাঠী ও বড়দের প্রতি ভালোবাসার অনুভূতি তৈরি হয়। ধীরে ধীরে কিছু নৈতিক ধারণাও গড়ে উঠতে শুরু করে।
সামাজিক বিকাশ
এই সময় শিশুর সামাজিক পরিবেশ পরিবার ছাড়িয়ে প্রতিবেশী ও সমবয়সিদের মধ্যে বিস্তৃত হয়।
খেলার সঙ্গীদের প্রতি—
- সহযোগিতা
- সহানুভূতি
- সমবেদনা
ইত্যাদি মনোভাব তৈরি হয়। পাশাপাশি প্রতিযোগিতার মনোভাবও দেখা দিতে পারে।
এই পর্যায়ে বন্ধুত্বের বিকাশ শুরু হয়।
২. বাল্যকাল (Childhood)
প্রায় ৬ বছর থেকে ১১ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কে বাল্যকাল বলা হয়। শিক্ষার দিক থেকে এটি প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়।
বাল্যকালকে সাধারণভাবে দুটি পর্যায়ে আলোচনা করা যায়—
- প্রাক্-বাল্যকাল: প্রায় ৬–৮ বছর
- প্রান্তীয় বাল্যকাল: প্রায় ৮–১১ বছর
নোট: প্রদত্ত মূল লেখায় প্রাক্-বাল্যকালের বয়সসীমা এক জায়গায় অসঙ্গতভাবে লেখা হয়েছে। উপরের বয়সসীমা ৬–১১ বছরের সামগ্রিক বিভাজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেওয়া হয়েছে।
প্রাক্-বাল্যকাল: ৬–৮ বছর
দৈহিক বিকাশ
এই পর্যায়ে শৈশবের তুলনায় দৈহিক বিকাশের গতি কিছুটা কমে যায়।
শিশুর সঞ্চালনমূলক দক্ষতা আরও উন্নত হয়। তারা দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থাকতে পছন্দ করে এবং শরীরকে দীর্ঘ সময় স্থির রাখতে চায় না।
এই সময় মস্তিষ্কের বিকাশও অনেকটা পরিণত অবস্থায় পৌঁছে যায়।
মানসিক বিকাশ
এই পর্যায়ে শিশুর মানসিক বিকাশ দ্রুত এগিয়ে যায়।
- শব্দভান্ডার বৃদ্ধি পায়
- স্মৃতিশক্তি বাড়ে
- মনোযোগের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়
- কল্পনাশক্তি প্রবল থাকে
- সংখ্যা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা তৈরি হয়
- যুক্তিশক্তির বিকাশ শুরু হয়
তবে এই বয়সে শিশু অনেক সময় বাস্তব ঘটনা ও কল্পনার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে পারে না।
প্রাক্ষোভিক বা আবেগীয় বিকাশ
এই পর্যায়ে কিছু শিশু নিরাপত্তার অভাব অনুভব করতে পারে। কল্পিত বিপদ থেকেও ভয় তৈরি হতে পারে।
দলের মধ্যে থাকলে শিশু নিজের আবেগ অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। বড়দের আচরণ ও মনোভাবও শিশুর আবেগীয় প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।
সামাজিক বিকাশ
এই পর্যায়ে শিশুর সামাজিক বৈশিষ্ট্য আরও স্থায়ী হতে শুরু করে।
শিশু দলগতভাবে খেলতে ভালোবাসে এবং ধীরে ধীরে আত্মকেন্দ্রিকতা কমিয়ে সমাজজীবনে অংশগ্রহণ করতে শেখে।
নৈতিক মূল্যবোধের প্রাথমিক বিকাশও এই সময়ে শুরু হয়।
প্রান্তীয় বাল্যকাল: ৮–১১ বছর
দৈহিক বিকাশ
এই পর্যায়ে দৈহিক বিকাশের গতি তুলনামূলকভাবে কম থাকে। দেহের বিভিন্ন অংশের বিকাশ আরও পরিপূর্ণ হয়।
মস্তিষ্কের বিকাশ অনেকটা পরিণত হয় এবং সূক্ষ্ম পেশির দক্ষতাও উন্নত হয়।
মানসিক বিকাশ
এই পর্যায়ে শিশুর আগ্রহ ও মনোযোগের পরিসর বৃদ্ধি পায়।
ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক বিষয় সম্পর্কে কৌতূহল তৈরি হয়।
শিশুর প্রত্যক্ষণ ক্ষমতা আরও পরিণত হলেও মানসিক পরিপক্বতা এখনও সম্পূর্ণ হয় না। চিন্তা ও যুক্তিশক্তির বিকাশ চলতে থাকে।
প্রাক্ষোভিক বা আবেগীয় বিকাশ
এই সময় আনন্দের অনুভূতি বেশ প্রবল হতে পারে। ছোটবেলার অকারণ ভয়ের পরিবর্তে বাস্তব ঘটনা থেকে ভয়ের অনুভূতি তৈরি হয়।
ভাই-বোন বা সমবয়সিদের প্রতি ঈর্ষার মনোভাবও দেখা দিতে পারে।
সামাজিক বিকাশ
এই পর্যায়ে দলগত আনুগত্য বৃদ্ধি পায়। বন্ধুত্বও আগের তুলনায় বেশি স্থায়ী হয়।
নৈতিক চরিত্রের বিকাশ ঘটে এবং সামাজিক আচরণ ধীরে ধীরে আরও পরিণত হতে থাকে।
৩. কৈশোরকাল (Adolescence)
প্রায় ১১ বছর থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কে কৈশোরকাল বলা হয়।
কৈশোর হলো শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পর্যায়।
এটি সাধারণভাবে দুটি ভাগে আলোচনা করা হয়—
- প্রাক্-কৈশোর: ১১–১৪ বছর
- প্রান্তীয় কৈশোর: ১৫–১৮ বছর
প্রাক্-কৈশোর: ১১–১৪ বছর
দৈহিক বিকাশ
এই পর্যায়ে অস্থি ও পেশির দ্রুত বিকাশ ঘটে। উচ্চতা বাড়ে এবং যৌন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিকাশ শুরু হয়।
ছেলেদের কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন ঘটে এবং যৌন গ্রন্থির বিকাশ হয়। মেয়েদেরও শারীরিক ও প্রজনন-সংক্রান্ত পরিবর্তন শুরু হয়।
মানসিক বিকাশ
এই সময় ধারণা গঠনের ক্ষমতা বাড়ে। শিশুর আগ্রহের বিষয়গুলো ধীরে ধীরে স্থায়ী হতে শুরু করে।
চিন্তাভাবনার মধ্যে সমন্বয় ঘটে এবং যুক্তি করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। বিমূর্ত ধারণা বোঝার ক্ষমতাও তৈরি হতে থাকে।
প্রাক্ষোভিক বা আবেগীয় বিকাশ
কৈশোরের শুরুতে আবেগের ওঠানামা বেশি দেখা যেতে পারে।
কখনও তীব্র আনন্দ, আবার কখনও মন খারাপ বা হতাশার অনুভূতি দেখা দিতে পারে।
লজ্জা, অপরাধবোধ, হীনম্মন্যতা ইত্যাদি আবেগও এই সময়ে প্রকাশ পেতে পারে।
সামাজিক বিকাশ
এই পর্যায়ে অনেক কিশোর-কিশোরী অন্যদের সঙ্গে সহজে মিশতে পারে না। পরিবার বা বাবা-মায়ের উপর নির্ভরশীলতা অনেক ক্ষেত্রে থাকে।
কৈশোরের শেষের দিকে আবার সমবয়সিদের দল ও বন্ধুদের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকে।
প্রান্তীয় কৈশোর: ১৫–১৮ বছর
দৈহিক বিকাশ
এই পর্যায়ে দৈহিক বিকাশের গতি ধীরে ধীরে কমে আসে এবং শারীরিক পরিণতি অর্জিত হয়।
যৌন গ্রন্থির কার্যক্রম আরও নিয়মিত হয় এবং ছেলে-মেয়েরা প্রাপ্তবয়স্ক শারীরিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে থাকে।
মানসিক বিকাশ
এই পর্যায়ে বৌদ্ধিক ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়।
- বিমূর্ত চিন্তার ক্ষমতা বাড়ে
- বিচারবোধ উন্নত হয়
- আগ্রহের বিষয় স্থায়ী হয়
- ধারণা গঠনের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়
- অভিজ্ঞতা থেকে শেখার প্রবণতা বাড়ে
প্রাক্ষোভিক বিকাশ
এই পর্যায়ে নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে। নিজের আবেগ ও প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা দেখা যায়।
আশঙ্কা ও অন্তর্দ্বন্দ্বের মতো অনুভূতিও থাকতে পারে।
সামাজিক বিকাশ
এই সময় দলগত সম্পর্কের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। মূল্যবোধ ও মনোভাব গড়ে ওঠে।
অন্যদের সামাজিক আচরণ অনুকরণ করার প্রবণতা দেখা যায় এবং তুলনামূলকভাবে স্থায়ী বন্ধুত্ব তৈরি হয়।
৪. প্রাপ্তবয়স্ককাল (Adulthood)
প্রায় ১৮ বছর থেকে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কে প্রাপ্তবয়স্ককাল বলা হয়েছে।
এই পর্যায়কে তিনটি ভাগে আলোচনা করা যায়—
- প্রাক্-প্রাপ্তবয়স্ক: ১৮–৩০ বছর
- মধ্য প্রাপ্তবয়স্ক: ৩১–৫০ বছর
- প্রান্তীয় প্রাপ্তবয়স্ক: ৫১–৬০ বছর
প্রাক্-প্রাপ্তবয়স্ককাল: ১৮–৩০ বছর
দৈহিক বিকাশ
এই পর্যায়ের শুরুতে শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি পায়। ওজনের পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
প্রথমদিকে দৈহিক শক্তি বৃদ্ধি পেলেও পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে তা কমতে শুরু করতে পারে।
স্বাস্থ্য ও জীবনযাপনের মানের উন্নতিও এই পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
মানসিক বিকাশ
এই সময় ব্যক্তির জ্ঞানের পরিসর বাড়ে। চিন্তাভাবনা আরও বাস্তবসম্মত হয়।
কৈশোরের তুলনায় ব্যক্তি বাস্তব পরিস্থিতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করতে শেখে।
প্রাক্ষোভিক বিকাশ
মনোবিজ্ঞানী Erik Erikson-এর মনোসামাজিক বিকাশ তত্ত্ব অনুযায়ী, এই পর্যায়ে ভালোবাসা, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও কাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই সময় ব্যক্তি নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।
সামাজিক বিকাশ
এই পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। ব্যক্তি পরিবার থেকে কিছুটা স্বাধীন হতে চায় এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে।
দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। সমাজের বিভিন্ন ঘটনা ও সামাজিক সম্পর্ক সম্পর্কে আগ্রহ বাড়ে।
মধ্য প্রাপ্তবয়স্ককাল: ৩১–৫০ বছর
দৈহিক বিকাশ
প্রায় ২০ বছর বয়সের মধ্যে উচ্চতা সাধারণত পূর্ণতার কাছাকাছি পৌঁছে যায় এবং মধ্য বয়স পর্যন্ত তা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে।
এই পর্যায়ের শেষদিকে শারীরিক শক্তি ও পেশির ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে হাড়ের পরিবর্তন ও শারীরিক সক্ষমতার কিছুটা হ্রাস দেখা দিতে পারে।
মানসিক বিকাশ
এই সময় কিছু মানসিক ক্ষমতা কমলেও অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও বিভিন্ন কৌশল ব্যবহারের ক্ষমতা বাড়তে পারে।
নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা কিছু ক্ষেত্রে কমলেও অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
প্রাক্ষোভিক বিকাশ
এই সময় ব্যক্তি পরবর্তী প্রজন্মকে নির্দেশনা ও সহায়তা দেওয়ার ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে।
দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পায় এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ধরনেও পরিবর্তন আসে।
সামাজিক বিকাশ
এই পর্যায়ে ব্যক্তি বিভিন্ন সামাজিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়।
পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ বাড়ে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ অনুযায়ী ব্যক্তির সামাজিক আচরণেও পরিবর্তন দেখা যায়।
প্রান্তীয় প্রাপ্তবয়স্ককাল: ৫১–৬০ বছর
দৈহিক বিকাশ
এই সময় বয়সের ছাপ শরীর ও ত্বকে স্পষ্ট হতে থাকে। চুল ধীরে ধীরে ধূসর ও পাতলা হতে পারে।
শরীরে ক্লান্তি বাড়তে পারে এবং শারীরিক ও পেশির ক্ষমতা আগের তুলনায় কমে যেতে পারে।
প্রত্যক্ষণ, স্পর্শ ও সংবেদনশীলতার ক্ষেত্রেও কিছুটা হ্রাস দেখা দিতে পারে।
মানসিক বিকাশ
এই পর্যায়ে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও স্মৃতির কিছু ক্ষমতা কমতে পারে। নতুন সমস্যা সমাধানে আগের তুলনায় বেশি সময় লাগতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে তথ্য মনে রাখা ও পরে তা স্মরণ করার ক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
প্রাক্ষোভিক বিকাশ
এই সময় ব্যক্তি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ও অর্জন নিয়ে চিন্তা করতে পারে।
অতীতের ঘটনা নিয়ে অনুশোচনা বা অসন্তুষ্টির অনুভূতি তৈরি হতে পারে। আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
সামাজিক বিকাশ
এই পর্যায়ে কিছু ক্ষেত্রে অন্যের সাহায্য ও নির্ভরতার প্রয়োজন বাড়তে পারে।
ফলে একাকীত্বের অনুভূতি তৈরি হতে পারে এবং সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
বিকাশের বিভিন্ন স্তর: এক নজরে
| বিকাশের স্তর | আনুমানিক বয়স | প্রধান বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| শৈশবকাল (Infancy) | জন্ম–৫/৬ বছর | দ্রুত শারীরিক, ভাষাগত ও সামাজিক বিকাশ |
| বাল্যকাল (Childhood) | ৬–১১ বছর | ভাষা, চিন্তা, নৈতিকতা ও সামাজিকতার বিকাশ |
| কৈশোরকাল (Adolescence) | ১১–১৮ বছর | দ্রুত শারীরিক পরিবর্তন, বিমূর্ত চিন্তা ও আবেগের পরিবর্তন |
| প্রাপ্তবয়স্ককাল (Adulthood) | ১৮–৬০ বছর | দায়িত্ব, সামাজিক সম্পর্ক, কর্মজীবন ও অভিজ্ঞতার বিকাশ |
পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
বিকাশের বিভিন্ন স্তর থেকে TET, CTET, Upper Primary TET, B.Ed এবং অন্যান্য শিক্ষকতা পরীক্ষায় প্রশ্ন আসতে পারে। তাই মনে রাখুন—
- শৈশবকাল → জন্ম থেকে প্রায় ৫/৬ বছর
- বাল্যকাল → প্রায় ৬–১১ বছর
- কৈশোরকাল → প্রায় ১১–১৮ বছর
- প্রাপ্তবয়স্ককাল → প্রায় ১৮–৬০ বছর
- প্রতিটি পর্যায়ে দৈহিক, মানসিক, প্রাক্ষোভিক ও সামাজিক বিকাশ ঘটে।
- বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে শিশুর ভাষা, চিন্তা, আবেগ, সামাজিক সম্পর্ক ও আচরণে পরিবর্তন আসে।
- কৈশোরে শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক ও আবেগীয় পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ।
- প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে দায়িত্ব, সামাজিক সম্পর্ক ও বাস্তব অভিজ্ঞতার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।
উপসংহার
মানুষের বিকাশ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। জন্ম থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, প্রাক্ষোভিক ও সামাজিক বিকাশ ঘটে। প্রতিটি স্তরের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
তাই Child Development বা শিশুর বিকাশ বুঝতে হলে বিকাশের বিভিন্ন স্তর এবং প্রতিটি স্তরের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে TET, CTET, Upper Primary TET এবং B.Ed পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই বিষয়টি ভালোভাবে পড়া দরকার।
