পরিণমন (Maturation) হল শিশুর স্বাভাবিক জৈবিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণ, অনুশীলন বা পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে শিশুর শরীর, স্নায়ুতন্ত্র ও আচরণে যে স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে, তাকে পরিণমন বলা হয়।
পরিণমনের অর্থ (Meaning of Maturation)
সহজ ভাষায়, অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই জন্মগত বৈশিষ্ট্য ও স্বাভাবিক জৈবিক বিকাশের কারণে শিশুর মধ্যে যে পরিবর্তন ঘটে, তাকে পরিণমন বলে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি শিশু ধীরে ধীরে বসতে শেখে, দাঁড়াতে শেখে এবং হাঁটতে শুরু করে। এসব আচরণের পেছনে শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক ও স্নায়বিক বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মনোবিদ W. B. Kolesnick-এর মতে, জন্মগত প্রবণতার স্বাভাবিক বিকাশের ফলে ব্যক্তির আচরণে পরিমাণগত ও গুণগত পরিবর্তন ঘটে। জন্মগত সম্ভাবনাগুলি বাস্তবে প্রকাশ পাওয়ার প্রক্রিয়াকেও পরিণমন বলা হয়।
অর্থাৎ, বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে স্বাভাবিক জৈবিক বিকাশের ফলে প্রশিক্ষণ বা বিশেষ অভিজ্ঞতা ছাড়াই শিশুর আচরণে যে পরিবর্তন আসে, সেটিই পরিণমন।
পরিণমনের সংজ্ঞা (Definition of Maturation)
বিভিন্ন মনোবিদ বিভিন্নভাবে পরিণমনের সংজ্ঞা দিয়েছেন। তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ মতামতগুলি নিচে দেওয়া হল।
Baldwin-এর মতে
“Maturation is an increase in competency and adaptability.”
অর্থাৎ, ব্যক্তির যোগ্যতা ও অভিযোজন ক্ষমতার বৃদ্ধি হল পরিণমন।
B. F. Skinner-এর মতে
“Maturation is development that will proceed fairly regularly even in the face of wide variations in environmental conditions.”
অর্থাৎ, পরিবেশের অবস্থার ব্যাপক পার্থক্য থাকলেও যে বিকাশ মোটামুটি স্বাভাবিক ও নিয়মিতভাবে ঘটে, তাকে পরিণমন বলা হয়।
Gesell-এর মতে
Gesell-এর মতে, ব্যক্তির স্নায়ুতন্ত্র তার নিজস্ব অন্তর্জাত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বিকশিত হয় এবং এর ফলে আচরণের প্রাথমিক রূপ প্রকাশ পায়। এই বিকাশের জন্য বাইরের কোনো বিশেষ উদ্দীপনা বা পূর্ব অভিজ্ঞতা অপরিহার্য নয়।
সহজভাবে বলা যায়, ব্যক্তির স্বাভাবিক ও অন্তর্জাত বিকাশই পরিণমনের মূল ভিত্তি।
McGoeth-এর মতে
জৈবিক বিকাশের কারণে বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব অভিজ্ঞতা বা বিশেষ প্রশিক্ষণ ছাড়াই আচরণে যে পরিবর্তন ঘটে, তাকে পরিণমন বলা হয়।
Thompson-এর মতে
পরিণমন হল এমন একটি বৃদ্ধির প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে শিশু ধীরে ধীরে একজন পরিণত ব্যক্তিতে পরিণত হয়।
পরিণমনের প্রকৃতি (Nature of Maturation)
পরিণমনের বিভিন্ন সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়।
১. অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ নিরপেক্ষ
পরিণমনের জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতা, অনুশীলন বা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না। এটি মূলত স্বাভাবিক জৈবিক বিকাশের ফল।
২. স্বাভাবিক বিকাশের ফল
পরিণমন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ব্যক্তি সচেতনভাবে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার চেষ্টা করে না।
৩. জৈবিক প্রক্রিয়া
পরিণমন মূলত ব্যক্তির শারীরিক বৃদ্ধি ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত।
৪. পূর্ব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন নেই
পরিণমনের জন্য পূর্ব অভিজ্ঞতা অপরিহার্য নয়। ব্যক্তির জন্মগত বৈশিষ্ট্য ও স্বাভাবিক বিকাশ এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৫. বাহ্যিক উদ্দীপকের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল নয়
পরিণমন মূলত অভ্যন্তরীণ বা জৈবিক বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই বাহ্যিক উদ্দীপক এর প্রধান নিয়ন্ত্রক নয়।
৬. শিক্ষার্থীর সক্রিয় প্রচেষ্টা প্রয়োজন হয় না
পরিণমন ঘটানোর জন্য শিশুকে বিশেষভাবে কোনো কাজ শেখানো বা অনুশীলন করানো জরুরি নয়।
৭. দৈহিক ও স্নায়বিক বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত
পরিণমনের প্রধান ভিত্তি হল শারীরিক বৃদ্ধি এবং স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশ।
৮. চাহিদার দ্বারা পরিচালিত নয়
পরিণমন ব্যক্তির কোনো নির্দিষ্ট চাহিদা পূরণের জন্য ঘটে না। তবে পরিণমনের ফলে অর্জিত সক্ষমতা পরবর্তীকালে বিভিন্ন চাহিদা পূরণে সাহায্য করে।
৯. আচরণে পরিবর্তন আনে
পরিণমনের ফলে ব্যক্তির আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত জৈবিক ও স্নায়বিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটে এবং নতুন নতুন আচরণ প্রকাশ পেতে পারে।
পরিণমনের বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Maturation)
পরিণমনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলি নিচে সহজভাবে আলোচনা করা হল।
১. সর্বজনীন প্রক্রিয়া (Universal Process)
পরিণমন শুধু মানুষের মধ্যেই দেখা যায় না; বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যেও স্বাভাবিক পরিণমন ঘটে। তাই এটিকে একটি সর্বজনীন প্রক্রিয়া বলা হয়।
২. চাহিদা নিরপেক্ষ (Need Neutral)
পরিণমন ব্যক্তি, পরিবার বা সমাজের নির্দিষ্ট চাহিদার উপর নির্ভরশীল নয়। এটি মূলত ব্যক্তির স্বাভাবিক জৈবিক বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত।
৩. জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া নয়
পরিণমন মানুষের সমগ্র জীবন ধরে একইভাবে চলতে থাকে না। বিকাশের নির্দিষ্ট পর্যায়ে এর ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি নির্দিষ্ট পরিণত স্তরে পৌঁছানোর সঙ্গে এর প্রভাব কমে আসে।
৪. অনুশীলন নিরপেক্ষ (Exercise Neutral)
পরিণমনের জন্য বিশেষ অনুশীলন বা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না। স্বাভাবিক বয়স বৃদ্ধি ও জৈবিক বিকাশের সঙ্গে এটি ঘটে।
৫. বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত
পরিণমন নিজে কোনো নির্দিষ্ট দক্ষতা নয়; বরং এটি এমন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে বিভিন্ন কাজের জন্য ব্যক্তির সক্ষমতা ধীরে ধীরে তৈরি হয়।
৬. বংশগতি দ্বারা প্রভাবিত
পরিণমনের ক্ষেত্রে বংশগতি (Heredity) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যক্তির জন্মগত বৈশিষ্ট্য ও সম্ভাবনা তার পরিণমনের গতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
পরিণমন ও শিশুর বিকাশ
শিশুর সামগ্রিক বিকাশ বোঝার ক্ষেত্রে পরিণমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিশুর বিকাশ শুধু শারীরিক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটে।
শিশুর বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি হল—
- দৈহিক বা শারীরিক বিকাশ (Physical Development)
- সঞ্চালনমূলক বিকাশ (Motor Development)
- মানসিক বা জ্ঞানীয় বিকাশ (Mental/Cognitive Development)
- সামাজিক বিকাশ (Social Development)
- প্রাক্ষোভিক বা আবেগীয় বিকাশ (Emotional Development)
তাই শিশুর সামগ্রিক বিকাশ বুঝতে হলে তার বিভিন্ন বিকাশের স্তর ও সেই স্তরের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন।
পরিণমন ও বিকাশের সম্পর্ক
পরিণমন এবং বিকাশ পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হলেও দুটিকে এক মনে করা উচিত নয়।
পরিণমন মূলত ব্যক্তির স্বাভাবিক জৈবিক ও স্নায়বিক বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে বিকাশ (Development) হল ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, আবেগীয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধারাবাহিক পরিবর্তনের বিস্তৃত প্রক্রিয়া।
সহজভাবে মনে রাখা যায়—
পরিণমন = স্বাভাবিক জৈবিক ও অন্তর্জাত বিকাশের প্রক্রিয়া।
পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট
পরিণমন (Maturation) সম্পর্কে মনে রাখার মতো বিষয়গুলি:
- পরিণমন একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া।
- এর সঙ্গে বংশগতি গুরুত্বপূর্ণভাবে সম্পর্কিত।
- পরিণমনের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ বা অনুশীলন প্রয়োজন হয় না।
- এটি ব্যক্তির স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও স্নায়বিক বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত।
- পরিণমন অভিজ্ঞতা নিরপেক্ষ।
- পরিণমন ব্যক্তির চাহিদার উপর নির্ভর করে না।
- পরিণমনের ফলে শিশুর আচরণে স্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়।
- Gesell পরিণমনের ক্ষেত্রে অন্তর্জাত বা স্বাভাবিক বিকাশের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।
- পরিণমন শিশুর সামগ্রিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
উপসংহার
পরিণমন হল শিশুর স্বাভাবিক জৈবিক ও স্নায়বিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণ বা পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে শিশুর মধ্যে যে স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে, তার পেছনে পরিণমনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিশুর শারীরিক, সঞ্চালনমূলক, মানসিক, সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশ বুঝতে পরিণমন (Maturation) ধারণাটি ভালোভাবে জানা প্রয়োজন।
