Class XII
Bengali
Geography
Mock Test
Class XI
Class X
Primary TET
Upper Primary TET
Competitive Exams
Math
LIVE Access mock tests, and notes for 300+ exams

জীববৈচিত্র্য (Biodiversity): সংজ্ঞা, প্রকারভেদ, গুরুত্ব, সংরক্ষণ ও বিনাশের কারণ

জীববৈচিত্র্য (Biodiversity): সংজ্ঞা, প্রকারভেদ, গুরুত্ব, সংরক্ষণ ও বিনাশের কারণ

জীববৈচিত্র্য (Biodiversity) বলতে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে থাকা বিভিন্ন ধরনের জীব, তাদের জিনগত বৈচিত্র্য, প্রজাতির বৈচিত্র্য এবং বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্যকে বোঝায়। পৃথিবীর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, খাদ্য, ওষুধ, কাঠসহ বিভিন্ন জৈব সম্পদের জোগান এবং জলবায়ুর স্থিতিশীলতার জন্য জীববৈচিত্র্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পোস্টে জীববৈচিত্র্যের সংজ্ঞা, প্রকারভেদ, জীববৈচিত্র্য হটস্পট, গুরুত্ব, বিনাশের কারণ এবং সংরক্ষণের উপায় সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো।


জীববৈচিত্র্য কী? | What is Biodiversity?

Bio শব্দের অর্থ জীবন বা প্রাণ এবং Diversity শব্দের অর্থ বৈচিত্র্য বা বিভিন্নতা। এই দুটি শব্দ থেকেই ইংরেজি Biodiversity শব্দটির উৎপত্তি। এর বাংলা প্রতিশব্দ হলো জীববৈচিত্র্য

সহজভাবে বলা যায়, কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্ত জিন, প্রজাতি এবং বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্য ও সমগ্রতাকে জীববৈচিত্র্য বলা হয়।

জীববৈচিত্র্যের তিনটি প্রধান স্তর

জীববৈচিত্র্যকে প্রধানত তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়—

  1. জিনগত বৈচিত্র্য
  2. প্রজাতিগত বৈচিত্র্য
  3. বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য

জীববৈচিত্র্য শব্দটি প্রথম কে ব্যবহার করেন?

১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে ওয়ালটার জি. রোজেন (Walter G. Rosen) প্রথম ‘Biodiversity’ বা ‘জীববৈচিত্র্য’ পরিভাষাটি উপস্থাপন করেন। পরবর্তীকালে ই. ও. উইলসন (E. O. Wilson) জীববৈচিত্র্য নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেন। তাই তাঁকে অনেক সময় জীববৈচিত্র্য ধারণার জনক বলা হয়।


জীববৈচিত্র্যের সংজ্ঞা

জীববৈচিত্র্যের একটি সহজ সংজ্ঞা হলো—

কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্ত জিন, প্রজাতি ও বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্য ও সমগ্রতাকে জীববৈচিত্র্য বলে।

১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত বসুন্ধরা সম্মেলনে জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে একটি বিস্তৃত সংজ্ঞা দেওয়া হয়। স্থলজ ও জলজ—সামুদ্রিকসহ বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের অন্তর্গত সজীব জীবের বৈচিত্র্যকে জীববৈচিত্র্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।


জীববৈচিত্র্যের প্রকারভেদ

জীববৈচিত্র্য প্রধানত তিন ধরনের—

১. জিনগত বৈচিত্র্য (Genetic Diversity)

একই প্রজাতির জীবদের জিনগত গঠনে পার্থক্যের কারণে তাদের বৈশিষ্ট্য ও গঠনে যে বিভিন্নতা দেখা যায়, তাকে জিনগত বৈচিত্র্য বলে।

জিনগত বৈচিত্র্যের বৈশিষ্ট্য

  • এটি একই প্রজাতির জীবদের মধ্যে দেখা যায়।
  • উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিভিন্ন জিনের কারণে জিনগত বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়।
  • জীবের বিভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে জিনগত বৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ।

২. প্রজাতিগত বৈচিত্র্য (Species Diversity)

কোনো অঞ্চলে যত ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির সমাবেশ দেখা যায়, তাকে সেই অঞ্চলের প্রজাতিগত বৈচিত্র্য বলা হয়।

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রজাতিগত বৈচিত্র্যের পরিমাণ এক নয়। ক্রান্তীয় অঞ্চলে প্রজাতিগত বৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

প্রজাতিগত বৈচিত্র্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য

  • কোনো অঞ্চলে উপস্থিত প্রজাতির সংখ্যা বোঝায়।
  • বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রে প্রজাতির বৈচিত্র্য আলাদা হতে পারে।
  • ক্রান্তীয় অঞ্চলে প্রজাতির বৈচিত্র্য তুলনামূলকভাবে বেশি।

প্রজাতিগত বৈচিত্র্যের পরিমাপক

প্রজাতিগত বৈচিত্র্য বোঝার জন্য কয়েকটি বিষয় ব্যবহার করা হয়—

ক. প্রজাতি সমৃদ্ধি:
কোনো অঞ্চলে মোট কত সংখ্যক প্রজাতি রয়েছে, তাকে প্রজাতি সমৃদ্ধি বলে।

খ. প্রজাতি প্রাচুর্য:
কোনো অঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির জীবের সংখ্যাগত আপেক্ষিক প্রাধান্যকে প্রজাতি প্রাচুর্য বলে।

গ. আন্তঃসম্পর্কযুক্ত বৈচিত্র্য:
কোনো অঞ্চলে বসবাসকারী পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল প্রজাতিগুলির বৈচিত্র্যকে আন্তঃসম্পর্কযুক্ত বৈচিত্র্য বলা হয়।


৩. বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য (Ecosystem Diversity)

বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তাকে বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য বলে।

প্রতিটি বাস্তুতন্ত্রে নিজস্ব জীবগোষ্ঠী থাকে। পরিবেশ ও জীবগোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বাস্তুতন্ত্র গড়ে ওঠে।


আলফা, বিটা ও গামা বৈচিত্র্য

জীববৈচিত্র্যকে পরিবেশ ও ভৌগোলিক পরিসরের ভিত্তিতেও আলফা, বিটা এবং গামা বৈচিত্র্য হিসেবে আলোচনা করা হয়।

আলফা বৈচিত্র্য (Alpha Diversity)

একই ধরনের বাসস্থানে বা একটি নির্দিষ্ট বাস্তুতন্ত্রে বিভিন্ন প্রজাতির বৈচিত্র্যকে আলফা বৈচিত্র্য বলে। বিজ্ঞানী হুইটেকার (Whitaker) একে Point Diversity বা বিন্দু বৈচিত্র্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিটা বৈচিত্র্য (Beta Diversity)

পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রজাতির গঠনে যে পরিবর্তন ঘটে, তাকে বিটা বৈচিত্র্য বলা হয়। যেমন, কোনো পর্বতের পাদদেশ থেকে শিখরের দিকে পরিবেশ পরিবর্তনের সঙ্গে উদ্ভিদ প্রজাতির সংখ্যাতেও পরিবর্তন দেখা যায়।

গামা বৈচিত্র্য (Gamma Diversity)

একটি বৃহৎ ভৌগোলিক অঞ্চলে প্রজাতিগত যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তাকে গামা বৈচিত্র্য বলে। বৃহৎ অঞ্চলে প্রজাতির পার্থক্য বেশি হলে গামা বৈচিত্র্যও বেশি হয়।


জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিভাষা

ক্ল্যাড (Clade)

কোনো প্রজাতির প্রাণী বা উদ্ভিদ এবং সেই প্রজাতির সমস্ত বংশধরকে একসঙ্গে ক্ল্যাড (Clade) বলা হয়।

বিলুপ্ত প্রজাতি

যেসব প্রজাতির অস্তিত্ব বর্তমানে আর নেই, তাদের বিলুপ্ত প্রজাতি বলা হয়।

উদাহরণ: মরিশাস দ্বীপের ডোডো পাখি।

বিপন্ন প্রজাতি

যেসব জীবপ্রজাতির একটি বড় অংশ বিলুপ্তির পথে রয়েছে, তাদের বিপন্ন প্রজাতি বলা হয়।

উদাহরণ: রয়েল বেঙ্গল টাইগার।

বন্য অবস্থায় বিলুপ্ত

যেসব প্রজাতি বন্য পরিবেশে বিলুপ্ত হয়েছে কিন্তু সংরক্ষণের মাধ্যমে টিকে আছে, তাদের এই শ্রেণিতে রাখা হয়।

বিরল প্রজাতি

যেসব প্রজাতির সংখ্যা অত্যন্ত কম, তাদের বিরল প্রজাতি বলা হয়।

উদাহরণ: হিমালয়ান সেলামান্ডার ও ঘড়িয়াল।

বাস্তুতান্ত্রিক বিলুপ্তি

কোনো প্রজাতির সংখ্যা এত কমে গেলে যে বাস্তুতন্ত্রের ওপর তার বিশেষ কোনো প্রভাব থাকে না, তাকে বাস্তুতান্ত্রিক বিলুপ্তি বলা হয়।


জীববৈচিত্র্য হটস্পট (Biodiversity Hotspot)

জীববৈচিত্র্য হটস্পট হলো এমন অঞ্চল যেখানে প্রচুর সংখ্যক প্রজাতি রয়েছে এবং একই সঙ্গে অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

১৯৮৮ সালে স্মিথসোনিয়ান জীববৈচিত্র্য সম্মেলনে ‘Megabiodiversity’ পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়। আর জীববৈচিত্র্য হটস্পট ধারণাটি বিজ্ঞানী নরম্যান মায়ার্স (Norman Myers)-এর সঙ্গে যুক্ত।
বর্তমানে পৃথিবীতে ৩৬টি জীববৈচিত্র্য হটস্পট রয়েছে বলে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কিত হটস্পটগুলির মধ্যে রয়েছে—

  • পশ্চিমঘাট পর্বতমালা
  • হিমালয়
  • সুন্দাল্যান্ড
  • ইন্দো-বার্মা অঞ্চল

ক্রান্তীয় অঞ্চলে জীববৈচিত্র্য বেশি কেন?

ক্রান্তীয় অঞ্চলে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় জীববৈচিত্র্য বেশি দেখা যায়। এর কয়েকটি কারণ হলো—

১. স্থিতিশীল জলবায়ু

ক্রান্তীয় অঞ্চলের জলবায়ু তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন প্রজাতি এখানে বসবাস করার সুযোগ পেয়েছে।

২. প্রাচীন জীবগোষ্ঠী

এই অঞ্চলের অনেক জীবগোষ্ঠী প্রাচীন। দীর্ঘ সময় ধরে বিবর্তনের সুযোগ পাওয়ায় এখানে বিভিন্ন প্রজাতির সৃষ্টি হয়েছে।

৩. সংকরায়ণের উচ্চ হার

বিভিন্ন প্রজাতি কাছাকাছি বসবাস করায় তাদের মধ্যে সংকরায়ণের সুযোগ বেশি থাকে।

৪. উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু

ক্রান্তীয় অঞ্চলে উষ্ণতা ও আর্দ্রতা বেশি। এই পরিবেশ জীবের বৃদ্ধি ও বৈচিত্র্য সৃষ্টির জন্য উপযোগী।

৫. পর্যাপ্ত সূর্যালোক

সারা বছর পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়। ফলে উদ্ভিদের উৎপাদনশীলতা বেশি হয় এবং বিভিন্ন প্রজাতির জীবের জন্য খাদ্যের জোগান বৃদ্ধি পায়।

৬. বিভিন্ন প্রজাতির সহাবস্থান

ক্রান্তীয় অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের জীব, কীট ও পরজীবীর সহাবস্থান দেখা যায়। ফলে কোনো একটি প্রজাতি সহজে এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না এবং বহু প্রজাতি একসঙ্গে বসবাস করে।


জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

জীববৈচিত্র্য শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, মানুষের জীবন ও পরিবেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১. বাস্তুতন্ত্র রক্ষা

বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন জীব খাদ্যশৃঙ্খল ও খাদ্যজালের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। কোনো একটি প্রজাতি বিলুপ্ত হলে তার প্রভাব পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর পড়তে পারে। তাই বাস্তুতন্ত্র রক্ষার জন্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ জরুরি।

২. জলসম্পদ রক্ষা

উদ্ভিদ মৃত্তিকাকে আবৃত রাখে এবং জলচক্র ও ভূগর্ভস্থ জল সংরক্ষণে সাহায্য করে। বন্যা ও খরা নিয়ন্ত্রণেও উদ্ভিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

৩. পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা

জীববৈচিত্র্য পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। কোনো প্রজাতির সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে বা কমে গেলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।

৪. জৈব সম্পদের জোগান

খাদ্য, ওষুধ, কাঠসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জৈব সম্পদের অন্যতম উৎস হলো জীববৈচিত্র্য। তাই ভবিষ্যতের জন্য এই সম্পদ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

৫. জলবায়ুর স্থিতিশীলতা

অরণ্য ও অন্যান্য প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র স্থানীয় ও আঞ্চলিক জলবায়ুর স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। অরণ্য পরিবেশকে শীতল রাখা এবং বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


জীববৈচিত্র্য বিনাশের কারণ

জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের কারণকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—

  1. প্রাকৃতিক কারণ
  2. মনুষ্যসৃষ্ট কারণ

A. জীববৈচিত্র্য বিনাশের প্রাকৃতিক কারণ

১. জলবায়ুর পরিবর্তন

দীর্ঘ সময় ধরে জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন করতে না পারায় বহু প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটেছে।

২. অগ্ন্যুৎপাত

অগ্ন্যুৎপাতের সময় লাভার প্রবাহে বহু উদ্ভিদ ও প্রাণী ধ্বংস হতে পারে। ফলে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়।

৩. ধূমকেতু, গ্রহাণু বা উল্কাপাত

গ্রহাণু বা উল্কা পৃথিবীর পৃষ্ঠে আঘাত করলে প্রচুর ধূলিকণা তৈরি হতে পারে। এর ফলে সূর্যের আলো বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পরিবেশ ও জীবজগতের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।

৪. মহীসঞ্চরণ

মহাদেশের ভূখণ্ডের পরিবর্তন ও সঞ্চরণের ফলে প্রাকৃতিক বাসস্থানের খণ্ডীকরণ হতে পারে। এর ফলে বিভিন্ন প্রজাতির অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়তে পারে।

৫. বন্যা, খরা ও মহামারি

বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বন্যা, খরা বা মহামারি দেখা দিলে বহু জীবের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। এর ফলে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হতে পারে।


B. জীববৈচিত্র্য বিনাশের মনুষ্যসৃষ্ট কারণ

বর্তমান সময়ে মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড জীববৈচিত্র্য হ্রাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

১. বৃক্ষছেদন

অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদ অরণ্যের ওপর নির্ভরশীল। ব্যাপকভাবে গাছ কেটে ফেললে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হয় এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি ঘটে।

২. অতিরিক্ত শিকার

অতিরিক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন শিকারের ফলে বহু বন্যপ্রাণীর সংখ্যা দ্রুত কমে যায়। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে কোনো কোনো প্রজাতি বিলুপ্তও হতে পারে।

৩. অতিমাত্রায় পশুপালন

অতিরিক্ত পশুচারণের ফলে ছোট গাছ, চারাগাছ ও গুল্ম নষ্ট হয়। এর ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি এবং জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয় ঘটে।

৪. পরিবেশ দূষণ

বায়ু, জল ও মাটির দূষণ বিভিন্ন জীবের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। রাসায়নিক দূষণ বিশেষভাবে সংবেদনশীল প্রজাতিগুলির অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে পারে।

৫. বহুমুখী নদী পরিকল্পনা

নদীতে বাঁধ নির্মাণ ও জলাধার তৈরির ফলে অনেক সময় প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ও প্রাণীদের আবাসস্থল নষ্ট হয়। এর ফলে জীববৈচিত্র্য হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি হয়।


জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উপায়

জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীবের আবাসস্থল সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

১. বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ

প্রাকৃতিক বাসস্থান ও বাস্তুতন্ত্রকে উপযুক্তভাবে সংরক্ষণ করলে সেখানে থাকা বিভিন্ন প্রজাতিকে রক্ষা করা সম্ভব।

২. জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ

একটি প্রজাতির মধ্যে থাকা জিনভাণ্ডার সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কৃষিকাজ ও বীজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জিনভাণ্ডার সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

৩. সঠিক ভূমিব্যবহার নীতি

জাতীয় স্তরে সঠিক ভূমিব্যবহার নীতি গ্রহণ করলে বনভূমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা করা সম্ভব।

৪. সংরক্ষণ পরিকল্পনা

অরণ্য, জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অঞ্চল এবং অন্যান্য সংরক্ষিত এলাকা তৈরি করে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা যায়।

৫. সংরক্ষিত জীবমণ্ডল স্থাপন

জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ অঞ্চলকে বৃহৎ সংরক্ষিত জীবমণ্ডল (Biosphere Reserve) হিসেবে গড়ে তুলে বিভিন্ন প্রজাতি ও তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ করা যায়।


অন্তঃক্ষেত্রীয় ও বহিঃক্ষেত্রীয় সংরক্ষণ

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো In-situ Conservation এবং Ex-situ Conservation

অন্তঃক্ষেত্রীয় সংরক্ষণ (In-situ Conservation)

কোনো বিপন্ন প্রজাতিকে তার স্বাভাবিক ও নিজস্ব বাসস্থানের মধ্যেই সংরক্ষণ করাকে অন্তঃক্ষেত্রীয় সংরক্ষণ বলে।

উদাহরণ:

  • ওড়িশার ভিতরকণিকায় ম্যানগ্রোভ অরণ্য সংরক্ষণ
  • পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ

বহিঃক্ষেত্রীয় সংরক্ষণ (Ex-situ Conservation)

কোনো জীবকে তার স্বাভাবিক বাসস্থান থেকে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে সংরক্ষণ করাকে বহিঃক্ষেত্রীয় সংরক্ষণ বলে।

উদাহরণ:

  • শিবপুরের উদ্ভিদ উদ্যান
  • আলিপুর চিড়িয়াখানা

ইন ভিট্রো সংরক্ষণ ও ক্রায়ো সংরক্ষণ

In-vitro Conservation হলো বিশেষ পদ্ধতিতে জীবের উপাদান বা বীজ সংরক্ষণের একটি ব্যবস্থা। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো ক্রায়ো সংরক্ষণ (Cryopreservation)

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, তরল নাইট্রোজেনের সাহায্যে প্রায় −১৯৬°C তাপমাত্রায় উদ্ভিদ ও শস্যবীজ সংরক্ষণ করা যায়। ভবিষ্যতে বিলুপ্তির আশঙ্কা রয়েছে এমন কিছু বীজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।


রেড ডাটা বুক, গ্রিন ডাটা বুক ও ব্ল্যাক ডাটা বুক

রেড ডাটা বুক (Red Data Book)

IUCN বিপন্ন বা লুপ্তপ্রায় জীবপ্রজাতির যে তালিকা প্রকাশ করে, তাকে রেড ডাটা বুক বলা হয়।

গ্রিন ডাটা বুক (Green Data Book)

অবলুপ্তির বিপদ থেকে মুক্ত জীবপ্রজাতির উল্লেখ থাকা তালিকাকে গ্রিন ডাটা বুক বলা হয়।

ব্ল্যাক ডাটা বুক (Black Data Book)

ধ্বংসসাধক বা ক্ষতিকর জীবপ্রজাতির উল্লেখ থাকা তালিকাকে ব্ল্যাক ডাটা বুক বলা হয়।


জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

পরীক্ষা ও সাধারণ জ্ঞানের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—

  • WWF: World Wildlife Fund
  • IUCN: International Union for Conservation of Nature and Natural Resources
  • UNEP: United Nations Environment Programme
  • ডোডো পাখির আদি বাসস্থান: মরিশাস দ্বীপ
  • মোয়া পাখির আদি বাসস্থান: নিউজিল্যান্ড
  • ভারতের বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন: ১৯৭২
  • ভারতের অরণ্য সংরক্ষণ আইন: ১৯৮০
  • ভারতের প্রথম জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল: নীলগিরি
  • পৃথিবীর প্রথম জাতীয় উদ্যান: ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক, আমেরিকা
  • বসুন্ধরা সম্মেলন: ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত হয়।

ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষণ প্রকল্প

প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী—

সংরক্ষণ প্রকল্প স্থান
বৃহত্তম ব্যাঘ্র প্রকল্প নাগার্জুন সাগর, অন্ধ্রপ্রদেশ
বৃহত্তম পক্ষীনিবাস ভরতপুর, রাজস্থান
বৃহত্তম সিংহ প্রকল্প গির, গুজরাট
বৃহত্তম গন্ডার প্রকল্প কাজিরাঙ্গা, অসম
বৃহত্তম হাতি প্রকল্প পেরিয়ার, কেরল
বৃহত্তম বাইসন প্রকল্প দাজিপুর, মহারাষ্ট্র


জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর

জীববৈচিত্র্য কী?

কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্ত জিন, প্রজাতি এবং বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্য ও সমগ্রতাকে জীববৈচিত্র্য বলে।

জীববৈচিত্র্যের প্রধান তিনটি স্তর কী?

জিনগত বৈচিত্র্য, প্রজাতিগত বৈচিত্র্য এবং বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য।

জীববৈচিত্র্য শব্দটি প্রথম কে উপস্থাপন করেন?

১৯৮৬ সালে ওয়ালটার জি. রোজেন ‘Biodiversity’ পরিভাষাটি উপস্থাপন করেন।

জীববৈচিত্র্য ধারণার জনক কাকে বলা হয়?

ই. ও. উইলসনকে জীববৈচিত্র্য ধারণার জনক বলা হয়।

জীববৈচিত্র্য হটস্পট কী?

যেসব প্রাকৃতিক আবাসস্থলে প্রচুর প্রজাতি রয়েছে এবং একই সঙ্গে অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে, সেই অঞ্চলকে জীববৈচিত্র্য হটস্পট বলা হয়।

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কেন প্রয়োজন?

বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা, জলসম্পদ সংরক্ষণ, জৈব সম্পদের জোগান, পরিবেশের ভারসাম্য এবং জলবায়ুর স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রয়োজন।


উপসংহার

জীববৈচিত্র্য পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। উদ্ভিদ, প্রাণী ও অন্যান্য জীব একে অপরের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত। তাই কোনো একটি প্রজাতির বিলুপ্তি পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

বৃক্ষছেদন, অতিরিক্ত শিকার, পরিবেশ দূষণ, আবাসস্থল ধ্বংসসহ বিভিন্ন কারণে জীববৈচিত্র্য দ্রুত হ্রাস পেতে পারে। তাই অরণ্য, বন্যপ্রাণী, প্রাকৃতিক আবাসস্থল, জিনগত সম্পদ এবং বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ করা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা মানে শুধু উদ্ভিদ ও প্রাণীকে রক্ষা করা নয়—বরং পৃথিবীর পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনকে সুরক্ষিত রাখা।

Share:
← Back to all posts