Class XII
Bengali
Geography
Mock Test
Class XI
Class X
Primary TET
Upper Primary TET
Competitive Exams
Math
LIVE Access mock tests, and notes for 300+ exams

মৌসুমী বায়ু (Monsoon): উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ ও গুরুত্ব

মৌসুমী বায়ু (Monsoon): উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ ও গুরুত্ব

মৌসুমী বায়ু (Monsoon): উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ ও গুরুত্ব

মৌসুমী বায়ু (Monsoon) হলো এমন এক ধরনের ঋতুভিত্তিক বায়ুপ্রবাহ, যা ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দিক পরিবর্তন করে। ‘Monsoon’ শব্দটি আরবি ‘Mausim’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ঋতু। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জলবায়ু এবং কৃষি ব্যবস্থায় মৌসুমী বায়ুর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

মৌসুমী বায়ু কী?

যে বায়ু ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ে দিক পরিবর্তন করে, তাকে মৌসুমী বায়ু বলা হয়। সাধারণত গ্রীষ্মকালে স্থলভাগ ও সমুদ্রের মধ্যে তাপমাত্রা ও বায়ুচাপের পার্থক্যের কারণে স্থলভাগের দিকে বায়ু প্রবাহিত হয় এবং শীতকালে তার বিপরীত দিকে প্রবাহিত হয়।

ভারতীয় উপমহাদেশে মৌসুমী বায়ুর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। গ্রীষ্মকালে সমুদ্র থেকে স্থলভাগের দিকে আর্দ্র বায়ু প্রবাহিত হয়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। শীতকালে সাধারণত স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে শুষ্ক বায়ু প্রবাহিত হয়।

মৌসুমী বায়ুর উৎপত্তির প্রধান কারণ

মৌসুমী বায়ুর উৎপত্তি একটি মাত্র কারণে হয় না। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ একসঙ্গে কাজ করে।

১. তাপীয় ধারণা (Thermal Concept)

মৌসুমী বায়ুর উৎপত্তি ব্যাখ্যা করার প্রাচীন ধারণাগুলির মধ্যে তাপীয় ধারণা অন্যতম। এই ধারণা অনুযায়ী, স্থলভাগ ও জলভাগের অসম উত্তাপের কারণে মৌসুমী বায়ুর সৃষ্টি হয়।

গ্রীষ্মকালে সূর্যের তাপে ভারতীয় উপমহাদেশের স্থলভাগ, বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিম ভারতের থর মরুভূমি ও তার সংলগ্ন অঞ্চল, অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ফলে এই অঞ্চলে একটি গভীর নিম্নচাপ কেন্দ্র সৃষ্টি হয়।

অন্যদিকে, ভারত মহাসাগরের ওপর তুলনামূলকভাবে উচ্চচাপ বিরাজ করে। বায়ু উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হওয়ায় ভারত মহাসাগর থেকে উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু ভারতীয় স্থলভাগের দিকে আসতে শুরু করে। নিরক্ষরেখা অতিক্রম করার পর পৃথিবীর আবর্তনের প্রভাবে এই বায়ু ডান-বাম দিকে বেঁকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুতে পরিণত হয়।

শীতকালে স্থলভাগ দ্রুত ঠান্ডা হয়ে উচ্চচাপ অঞ্চলে পরিণত হয়। তখন বায়ু স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয় এবং উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ু সৃষ্টি হয়।

তাপীয় ধারণার মূল কথা:

গ্রীষ্মকাল → স্থলভাগে নিম্নচাপ → সমুদ্র থেকে স্থলভাগে বায়ুপ্রবাহ → দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু

শীতকাল → স্থলভাগে উচ্চচাপ → স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে বায়ুপ্রবাহ → উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ু

২. জেফ্রিসের তত্ত্ব (Jeffreys’ Theory)

ভূগোলবিদ জেফ্রিস (Jeffreys) মৌসুমী বায়ুর উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে স্থলভাগ ও জলভাগের মধ্যে বায়ুর উষ্ণতা ও চাপের পার্থক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাঁর মতে, নিম্ন বায়ুমণ্ডলে জলভাগ থেকে স্থলভাগের দিকে এবং উচ্চ বায়ুমণ্ডলে তার বিপরীত দিকে অর্থাৎ স্থলভাগ থেকে জলভাগের দিকে বায়ুপ্রবাহ ঘটে।

ফলে স্থলভাগ ও জলভাগের মধ্যে একটি বায়ুচক্র বা আবর্তন সৃষ্টি হয়। এই বায়ুচক্রের ফলেই মৌসুমী বায়ুর আবির্ভাব ঘটে।

সহজভাবে বলা যায়, স্থলভাগ ও জলভাগের মধ্যে তাপমাত্রা ও বায়ুচাপের পার্থক্য একটি বৃহৎ বায়ুপ্রবাহের ব্যবস্থা তৈরি করে। জেফ্রিসের তত্ত্বে এই বায়ুপ্রবাহকেই মৌসুমী বায়ুর উৎপত্তির অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

৩. থার্মাল ইঞ্জিন তত্ত্ব (Thermal Engine Theory)

মৌসুমী বায়ুর উৎপত্তি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তিব্বত মালভূমির ভূমিকা এই তত্ত্বে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। গ্রীষ্মকালে এপ্রিল-মে মাসে তিব্বত মালভূমি সূর্যের তাপে অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

তিব্বত মালভূমি একটি বিস্তীর্ণ উচ্চভূমি এবং এর চারদিকে পর্বত দ্বারা বেষ্টিত হওয়ায় গ্রীষ্মকালে সেখানে প্রচুর তাপ সঞ্চিত হয়। ফলে তিব্বত মালভূমি একটি উষ্ণ তাপীয় অঞ্চল বা ‘তাপ দ্বীপে’ পরিণত হয় এবং এর ওপরের বায়ু উত্তপ্ত হয়ে নিম্নমুখী চাপের পরিবর্তন ঘটায়।

এই উষ্ণতার প্রভাবে তিব্বত মালভূমির ওপর ও আশপাশের বায়ুমণ্ডলে একটি শক্তিশালী বায়ু সঞ্চালন ব্যবস্থা তৈরি হয়। উচ্চস্তরে, প্রায় ৯–১২ কিলোমিটার উচ্চতায়, বায়ুপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে এবং সেখান থেকে বায়ু চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

এই সামগ্রিক বায়ু সঞ্চালনের ফলে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে আর্দ্র বায়ু ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে আকৃষ্ট হয়। এই আর্দ্র বায়ুই দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু হিসেবে ভারতে প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ঘটায়।

অর্থাৎ, এই তত্ত্বে তিব্বত মালভূমিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘তাপীয় ইঞ্জিন’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা মৌসুমী বায়ুর সঞ্চালনকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।

৪. পৃথিবীর আবর্তন

পৃথিবীর আবর্তনের কারণে বায়ুপ্রবাহ সরাসরি উত্তর-দক্ষিণ দিকে না গিয়ে বাঁক নিয়ে প্রবাহিত হয়। এই ঘটনাকে কোরিওলিস বল (Coriolis Force) বলা হয়। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর সৃষ্টি ও প্রবাহে পরিবর্তন ঘটে।

৫. জেট স্ট্রিম মতবাদ (Jet Stream Theory)

মৌসুমী বায়ুর উৎপত্তি ও আগমন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে জেট স্ট্রিম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেট স্ট্রিম হলো বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে প্রবাহিত অত্যন্ত দ্রুতগতির বায়ুপ্রবাহ।

গ্রীষ্মকালে মে মাসের শেষের দিকে উপক্রান্তীয় পশ্চিমী জেট বায়ু হিমালয়ের উত্তরে সরে যায়। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের ওপর বায়ুমণ্ডলের পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে।

একই সময়ে ক্রান্তীয় অঞ্চলে ক্রান্তীয় পূবালী জেট বায়ু (Tropical Easterly Jet) গড়ে ওঠে। এই জেট বায়ু মৌসুমী বায়ুর আগমন ও সক্রিয়তাকে প্রভাবিত করে এবং দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর প্রবাহ বজায় রাখতে সাহায্য করে।

তাই জেট স্ট্রিমের অবস্থান ও গতিপথের পরিবর্তন ভারতীয় মৌসুমী বায়ুর আগমন, শক্তি ও বৃষ্টিপাতের ধরন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

মৌসুমী বায়ুর প্রকারভেদ

ভারতীয় উপমহাদেশে মৌসুমী বায়ুকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়—

১. গ্রীষ্মকালীন মৌসুমী বায়ু

গ্রীষ্মকালে ভারতীয় উপমহাদেশের স্থলভাগ অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে নিম্নচাপ সৃষ্টি করে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে আর্দ্র বায়ু স্থলভাগের দিকে প্রবাহিত হয়। এই বায়ু ভারতে প্রধানত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু নামে পরিচিত।

এই বায়ু দুটি প্রধান শাখায় বিভক্ত হয়—

ক) আরব সাগরীয় শাখা:
আরব সাগর থেকে আগত এই শাখা পশ্চিম উপকূল ও পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। এরপর এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়।

খ) বঙ্গোপসাগরীয় শাখা:
বঙ্গোপসাগর থেকে আগত এই শাখা উত্তর-পূর্ব ভারত ও গাঙ্গেয় সমভূমিতে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। পাহাড় ও ভূপ্রকৃতির প্রভাবে এই অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত দেখা যায়।

২. শীতকালীন মৌসুমী বায়ু

শীতকালে ভারতীয় স্থলভাগ ঠান্ডা হয়ে উচ্চচাপ অঞ্চলে পরিণত হয়। ফলে স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে বায়ু প্রবাহিত হয়। এই বায়ু সাধারণত উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ু নামে পরিচিত।

এই বায়ু স্থলভাগ থেকে আসায় সাধারণত শুষ্ক থাকে। তবে বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় এটি জলীয়বাষ্প সংগ্রহ করে এবং দক্ষিণ-পূর্ব ভারতে বৃষ্টিপাত ঘটায়। বিশেষ করে তামিলনাড়ু ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলে এই বায়ুর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ।

মৌসুমী বায়ুর বৈশিষ্ট্য

মৌসুমী বায়ুর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—

  • ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে বায়ুর দিক পরিবর্তিত হয়।
  • স্থলভাগ ও সমুদ্রের অসম উত্তাপ মৌসুমী বায়ুর অন্যতম প্রধান কারণ।
  • গ্রীষ্মকালে সমুদ্র থেকে স্থলভাগের দিকে আর্দ্র বায়ু প্রবাহিত হয়।
  • গ্রীষ্মকালীন মৌসুমী বায়ু প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়।
  • মৌসুমী বৃষ্টিপাতের সময় ও পরিমাণ সব অঞ্চলে সমান নয়।
  • মৌসুমী বৃষ্টিপাতের মধ্যে কখনও বিরতি বা বর্ষণ-বিরতি (Break in Monsoon) দেখা যায়।
  • পাহাড় ও ভূ-প্রকৃতি মৌসুমী বায়ুর বৃষ্টিপাতের ধরনকে প্রভাবিত করে।
  • মৌসুমী বায়ু কৃষি ও অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

মৌসুমী বায়ুর গুরুত্ব

ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি অনেকাংশে মৌসুমী বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। এর প্রধান গুরুত্বগুলি হলো—

১. কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্ব

ধান, পাট, আখ, তুলা, চা-সহ বিভিন্ন ফসলের জন্য পর্যাপ্ত বৃষ্টির প্রয়োজন হয়। মৌসুমী বৃষ্টি কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় জল সরবরাহ করে।

২. জলসম্পদ

মৌসুমী বৃষ্টির জল নদী, পুকুর, জলাধার ও ভূগর্ভস্থ জলস্তর পূরণ করতে সাহায্য করে।

৩. বিদ্যুৎ উৎপাদন

জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির জন্য প্রয়োজনীয় জল সরবরাহে মৌসুমী বৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

৪. অর্থনীতিতে প্রভাব

ভালো মৌসুমী বৃষ্টি হলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হয়। আবার অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি হলে কৃষি ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

৫. পরিবেশের ওপর প্রভাব

মৌসুমী বৃষ্টি মাটি ও উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা সরবরাহ করে এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে।

মৌসুমী বায়ুর অনিয়মিত প্রকৃতি

মৌসুমী বায়ু প্রতিবছর একই রকম আচরণ করে না। কখনও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টি হয়, আবার কখনও বৃষ্টির পরিমাণ কম হয়। এল নিনো (El Niño), লা নিনা (La Niña), সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, বায়ুচাপের পরিবর্তন এবং অন্যান্য বায়ুমণ্ডলীয় প্রক্রিয়া মৌসুমী বৃষ্টিপাতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে বন্যা ও জলাবদ্ধতা হতে পারে। আবার বৃষ্টির ঘাটতির ফলে খরা ও জলসংকট দেখা দিতে পারে।

 

মৌসুমী বায়ু পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঋতুভিত্তিক বায়ুপ্রবাহ। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের জলবায়ু, কৃষি, জলসম্পদ, অর্থনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন মৌসুমী বায়ুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায় এবং শীতকালে উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ু প্রধানত স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়। তাই ভারতীয় উপমহাদেশের জলবায়ু বোঝার ক্ষেত্রে মৌসুমী বায়ু (Monsoon) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

Share:
← Back to all posts