প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খলা (Emotional Disturbance): সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, শ্রেণিবিভাগ ও শিক্ষাব্যবস্থা
প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খলা কী? (What is Emotional Disturbance?)
প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খলা বা Emotional Disturbance বলতে এমন একটি অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে শিশুর আবেগ, আচরণ, সামাজিক সম্পর্ক এবং বিদ্যালয়ের কাজকর্মে দীর্ঘস্থায়ী ও উল্লেখযোগ্য সমস্যা দেখা যায়।
প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খলার কোনো একটি সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা নেই। তাই সাধারণত শিশুর আচরণ ও ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখে এই সমস্যা সম্পর্কে ধারণা করা হয়।
Brower (1969)-এর মতে, কোনো শিশু দীর্ঘ সময় ধরে নিচের এক বা একাধিক সমস্যা প্রদর্শন করলে তাকে প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খলার আওতায় বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রধান লক্ষণ
-
শেখা বা কোনো বিষয় উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে সমস্যা।
-
শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে উপযুক্ত সম্পর্ক তৈরি করতে না পারা।
-
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিক বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করা।
-
অতিরিক্ত মানসিক অশান্তি, হতাশা বা উদ্বেগে ভোগা।
-
ব্যক্তিগত বা বিদ্যালয়ের সমস্যাকে শারীরিক উপসর্গের মাধ্যমে প্রকাশ করা।
-
বারবার রাগ, ভয়, কান্না বা আক্রমণাত্মক আচরণ করা।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে—একবার বা সাময়িকভাবে কোনো শিশু অস্বাভাবিক আচরণ করলেই তাকে প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খল শিশু বলা যায় না।
শিশুর আচরণের পুনরাবৃত্তি, তীব্রতা, স্থায়িত্ব এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার উপস্থিতি বিবেচনা করে এই সমস্যা শনাক্ত করা হয়।
প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খলার শ্রেণিবিভাগ
Hallahan ও Kauffman (1978) প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খলার বিভিন্ন সমস্যাকে প্রধানত 3টি ভাগে আলোচনা করেছেন।
1. আচরণগত সমস্যা (Behavioural Problems)
এই ধরনের সমস্যায় শিশুর আচরণে অসামঞ্জস্য দেখা যায়। যেমন—
-
অবাধ্যতা
-
ধ্বংসাত্মক প্রবণতা
-
ঝগড়াটে মনোভাব
-
অতিরিক্ত হইচই করা
-
অপ্রাসঙ্গিক আচরণ
-
হিংসা ও ক্রোধ
-
অন্যের উপর কর্তৃত্ব করার প্রবণতা
-
অতিরিক্ত মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা
-
অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণ
-
মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা
2. ব্যক্তিসত্তা সংক্রান্ত সমস্যা (Personality Problems)
এক্ষেত্রে শিশুর নিজের সম্পর্কে ধারণা ও আবেগের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা যায়।
প্রধান বৈশিষ্ট্য—
-
হীনম্মন্যতা
-
হতাশা
-
অতিরিক্ত আত্মসচেতনতা
-
উৎকণ্ঠা
-
অতিরিক্ত কান্নার প্রবণতা
-
অতিসংবেদনশীলতা
-
হাসিখুশি না থাকা
-
লজ্জা
-
বিষণ্ণতা
-
দাঁত দিয়ে নখ কাটার মতো উদ্বেগজনিত আচরণ
3. পরিণমনে অসম্পূর্ণতাজনিত সমস্যা (Immaturity Problems)
এই ধরনের শিশুর আচরণ বয়সের তুলনায় অপরিণত মনে হতে পারে।
যেমন—
-
দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা
-
বিশৃঙ্খল আচরণ
-
সমস্যা থেকে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা
-
দিবাস্বপ্ন দেখা
-
অতিরিক্ত অলসতা
-
হতবুদ্ধি বা বিভ্রান্ত আচরণ
-
নিজের বয়সের তুলনায় কম বয়সি শিশুদের সঙ্গে খেলতে পছন্দ করা
-
অবুঝের মতো হাসা
-
অকারণে চিৎকার করা
-
অসচেতনভাবে বিভিন্ন জিনিস মুখে দেওয়া
প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খলা শনাক্তকরণ (Identification of Emotional Disturbance)
প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খলা শনাক্ত করা সবসময় সহজ নয়। কারণ শিশুর আচরণ বিভিন্ন পরিবেশে বিভিন্ন রকম হতে পারে। অনেক সময় বাড়িতে সমস্যা কম দেখা গেলেও বিদ্যালয়ে সমস্যা বেশি প্রকাশ পায়।
বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও সহপাঠীরা শিশুর আচরণ কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পান। তাই প্রাথমিকভাবে শনাক্তকরণে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
শনাক্তকরণের প্রধান পদ্ধতি
-
শিক্ষকের মূল্যায়ন
-
শিক্ষকের মাধ্যমে শিশুর আচরণ মূল্যায়ন
-
সহপাঠীদের মাধ্যমে শিশুর আচরণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ
-
শিক্ষকের প্রত্যক্ষ ও সক্রিয় পর্যবেক্ষণ
শনাক্তকরণের সময় সতর্কতা
শিশুর কোনো একটি আচরণ দেখে তাড়াহুড়ো করে তাকে প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খল বলে চিহ্নিত করা উচিত নয়।
কারণ—
-
কোনো আচরণ সাময়িক হতে পারে।
-
শিক্ষক বা সহপাঠী শিশুর সমস্যা সঠিকভাবে বুঝতে নাও পারেন।
-
শিশু সবসময় বিদ্যালয়ে তার সমস্যার প্রকাশ নাও করতে পারে।
-
শিশুর পারিবারিক বা সামাজিক পরিবেশও তার আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই দীর্ঘ সময় ধরে শিশুর আচরণ পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খল শিশুর বৈশিষ্ট্য
প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খলার মাত্রা অনুযায়ী শিশুর সমস্যা মৃদু, মধ্যম, গুরুতর বা অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে।
1. বৌদ্ধিক বৈশিষ্ট্য (Intellectual Characteristics)
প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খল শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা একই রকম নয়।
-
অনেক শিশুর বৌদ্ধিক ক্ষমতা স্বাভাবিক বা স্বাভাবিকের কাছাকাছি হতে পারে।
-
কিছু শিশুর শিক্ষাগত পারফরম্যান্স কম হতে পারে।
-
গুরুতর সমস্যার ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্ষমতায় বেশি অসুবিধা দেখা দিতে পারে।
-
আবার কিছু শিশু অত্যন্ত বুদ্ধিমানও হতে পারে।
পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ: প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খলা থাকলেই যে শিশুর বুদ্ধি কম হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
2. সামাজিক ও প্রাক্ষোভিক বৈশিষ্ট্য
এই শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও আবেগগত সমস্যা দেখা যেতে পারে।
যেমন—
-
আক্রমণাত্মক আচরণ
-
মারামারি বা ঝগড়া করা
-
চিৎকার করা
-
অতিরিক্ত কান্না
-
ধ্বংসাত্মক আচরণ
-
অন্যকে আঘাত করা
-
বড়দের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণ
-
সহপাঠীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি করতে অসুবিধা
-
সামাজিকভাবে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা
-
দায়িত্বহীনতা
-
গালিগালাজ করা
-
অতিরিক্ত কর্তৃত্বপ্রিয়তা
-
হিংসা ও দ্বন্দ্বপ্রবণতা
-
বিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম মানতে অনীহা
তবে সব প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খল শিশুর মধ্যে একই ধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যাবে না।
প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খল শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থা
প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খল শিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রে শুধু পাঠ্যবিষয় শেখানো যথেষ্ট নয়। তাদের আবেগ, আচরণ, সামাজিক সম্পর্ক ও মানসিক প্রয়োজনের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
1. মনোবৈজ্ঞানিক সহায়তা
প্রাক্ষোভিক সমস্যার সঙ্গে মানসিক ও সামাজিক কারণ যুক্ত থাকতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী—
-
মনোবিজ্ঞানী
-
কাউন্সেলর
-
চিকিৎসক
-
বিশেষ শিক্ষক
এর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
2. আনন্দদায়ক বিদ্যালয় পরিবেশ
বিদ্যালয়ের পরিবেশ শিশুবান্ধব ও আনন্দময় হওয়া উচিত।
শিক্ষককে—
-
শিক্ষার্থীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।
-
শিশুর ব্যক্তিগত সমস্যার প্রতি নজর দিতে হবে।
-
ভয়ভিত্তিক পরিবেশ এড়িয়ে চলতে হবে।
-
সহযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
3. সহপাঠক্রমিক কার্যাবলি
শিশুর আবেগ প্রকাশ ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
যেমন—
-
গান
-
বাদ্যযন্ত্র
-
নৃত্য
-
নাটক
-
আবৃত্তি
-
খেলাধুলা
-
সৃজনশীল কাজ
4. শিক্ষার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণ
শিখন-শেখানোর সময় শিক্ষার্থীকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। শুধু বক্তৃতাভিত্তিক শিক্ষার পরিবর্তে কার্যভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা বেশি কার্যকর হতে পারে।
5. উৎসাহ ও ইতিবাচক স্বীকৃতি
শিশুর ভালো আচরণ ও ছোট ছোট সাফল্যের জন্য—
-
প্রশংসা
-
উৎসাহ
-
স্বীকৃতি
-
পুরস্কার
দেওয়া যেতে পারে।
এতে শিশুর আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক আচরণ বৃদ্ধি পেতে পারে।
6. একীভূত শিক্ষা (Inclusive Education)
মৃদু ও মধ্যম মাত্রার প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খল শিশুদের ক্ষেত্রে যতদূর সম্ভব একীভূত বা Inclusive Education-এর ব্যবস্থা করা উচিত।
প্রয়োজনে—
-
দিনের অধিকাংশ সময় সাধারণ শ্রেণিকক্ষে রাখা যেতে পারে।
-
অতিরিক্ত সহায়তার জন্য কিছু সময় Resource Room-এ শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে।
-
শিশুকে অন্য শিক্ষার্থীদের থেকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আলাদা করা উচিত নয়।
মূল লক্ষ্য হবে শিশুকে ধীরে ধীরে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা।
পরিবার ও সমাজের ভূমিকা
প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খলা শুধু ব্যক্তিগত বা মানসিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; অনেক সময় পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশও শিশুর আচরণকে প্রভাবিত করে।
তাই শিশুর উন্নতির জন্য প্রয়োজন—
-
পরিবারে ভালোবাসাপূর্ণ পরিবেশ
-
শিক্ষক-অভিভাবকের সহযোগিতা
-
সহপাঠীদের ইতিবাচক মনোভাব
-
প্রতিবেশী ও সমাজের সহযোগিতা
-
শিশুর প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ
-
প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার কাউন্সেলিং
শিশুকে 'খারাপ', 'অবাধ্য' বা 'সমস্যাজনক' বলে চিহ্নিত না করে তার সমস্যার কারণ বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
MCQ পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
দ্রুত মনে রাখুন
-
Emotional Disturbance = প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খলা
-
প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খলার একটি সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা নেই।
-
Brower (1969) প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খল শিশুর বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেন।
-
Hallahan ও Kauffman (1978) সমস্যাগুলিকে 3টি প্রধান ভাগে আলোচনা করেন।
-
প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খলার 3টি প্রধান সমস্যা:
-
আচরণগত সমস্যা
-
ব্যক্তিসত্তা সংক্রান্ত সমস্যা
-
পরিণমনে অসম্পূর্ণতাজনিত সমস্যা
-
-
শনাক্তকরণে শিক্ষক ও সহপাঠীর পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
-
একটি সাময়িক অস্বাভাবিক আচরণ দেখেই শিশুকে প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খল বলা উচিত নয়।
-
আচরণের পুনরাবৃত্তি, তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
-
প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খলা থাকলেই শিশুর বুদ্ধি কম হবে—এমন নয়।
-
মৃদু ও মধ্যম মাত্রার ক্ষেত্রে Inclusive Education গুরুত্বপূর্ণ।
-
Resource Room অতিরিক্ত সহায়তা প্রদানে ব্যবহার করা যেতে পারে।
-
শিক্ষক, পরিবার, সহপাঠী ও সমাজ—সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।
-
শিশুকে শাস্তি না দিয়ে সহানুভূতি, উৎসাহ ও ইতিবাচক স্বীকৃতি দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
প্রাক্ষোভিক বিশৃঙ্খল শিশুর সমস্যা শুধু তার আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে তার আবেগ, সামাজিক সম্পর্ক, শিক্ষণ এবং পারিবারিক পরিবেশও জড়িত। তাই শিক্ষককে শিশুর আচরণকে শুধু 'অবাধ্যতা' হিসেবে না দেখে সমস্যার কারণ বোঝার চেষ্টা করতে হবে। উপযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা, কাউন্সেলিং, পরিবার ও বিদ্যালয়ের সহযোগিতা এবং ইতিবাচক পরিবেশের মাধ্যমে এই শিশুদের শিক্ষাজীবনে সফলভাবে যুক্ত করা সম্ভব।
