ভূমিকা
শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়াকে সফল করার জন্য শিক্ষককে আগে থেকেই ঠিক করতে হয়, পাঠ শেষে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে, কী বুঝবে এবং কী করতে পারবে। এই নির্দিষ্ট শিক্ষণ-উদ্দেশ্য ও শিখন ফলাফল নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষাবিদ বেঞ্জামিন ব্লুমের (Benjamin Bloom) শ্রেণিবিন্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
Bloom's Taxonomy হলো শিক্ষার উদ্দেশ্যগুলিকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করার একটি পদ্ধতি। এর সাহায্যে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, বোধ, চিন্তাশক্তি, মনোভাব ও শারীরিক দক্ষতার বিকাশ ঘটাতে পারেন।
TET, CTET এবং CDP পরীক্ষায় ব্লুমের শ্রেণিবিন্যাস থেকে বিভিন্ন ধরনের MCQ প্রশ্ন আসে।
নির্দেশমূলক উদ্দেশ্যের ধারণা (Concept of Instructional Objectives)
নির্দেশমূলক উদ্দেশ্য বলতে বোঝায়, শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়ার শেষে শিক্ষার্থীর মধ্যে যে নির্দিষ্ট জ্ঞান, দক্ষতা, মনোভাব বা আচরণের পরিবর্তন প্রত্যাশা করা হয়।
সহজ কথায়, পাঠ শেষে শিক্ষার্থী কী জানতে পারবে, কী বুঝতে পারবে এবং কী করতে পারবে—তার স্পষ্ট বিবরণই নির্দেশমূলক উদ্দেশ্য।
উদাহরণ: পরিবেশ দূষণ বিষয়ে পাঠদানের পরে শিক্ষার্থী পরিবেশ দূষণের 3টি কারণ উল্লেখ করতে পারবে।
এখানে 3টি কারণ উল্লেখ করার ক্ষমতাটি একটি নির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য শিখন ফলাফল।
নির্দেশমূলক উদ্দেশ্য সাধারণত শিক্ষার্থীর বয়স, শ্রেণি, পাঠ্যবিষয় এবং শিখনের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। এগুলি শিক্ষকের পাঠ পরিকল্পনা এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি নির্বাচনে সাহায্য করে।
নির্দেশমূলক উদ্দেশ্যের বৈশিষ্ট্য
-
এগুলি নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট হয়।
-
শিক্ষার্থীর প্রত্যাশিত আচরণ বা দক্ষতার কথা উল্লেখ করে।
-
শিখনের ফলাফল পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করতে সাহায্য করে।
-
পাঠ্যবিষয় ও শিক্ষার্থীর শিক্ষাস্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
-
শিক্ষণ পদ্ধতি ও শিক্ষণ-উপকরণ নির্বাচনে সাহায্য করে।
-
শিক্ষার্থীর অগ্রগতি নির্ধারণে সাহায্য করে।
শিক্ষামূলক উদ্দেশ্য ও নির্দেশমূলক উদ্দেশ্যের পার্থক্য
| শিক্ষামূলক উদ্দেশ্য | নির্দেশমূলক উদ্দেশ্য |
|---|---|
| এর পরিধি ব্যাপক। | এর পরিধি তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ ও নির্দিষ্ট। |
| দর্শন, সমাজ ও শিক্ষার বৃহত্তর লক্ষ্য দ্বারা প্রভাবিত। | শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়া এবং শিক্ষার্থীর প্রত্যাশিত ফলাফলের সঙ্গে সম্পর্কিত। |
| দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। | সাধারণত নির্দিষ্ট পাঠ বা শিক্ষণ কার্যক্রমের ফলাফল নির্ধারণ করে। |
| শিক্ষার্থীর সামগ্রিক বিকাশে গুরুত্ব দেয়। | নির্দিষ্ট জ্ঞান, দক্ষতা ও আচরণ অর্জনে গুরুত্ব দেয়। |
| অর্জন সরাসরি পরিমাপ করা কঠিন হতে পারে। | যথাযথভাবে নির্ধারণ করা হলে অর্জন পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপ করা সহজ হয়। |
নির্দেশমূলক উদ্দেশ্যের গুরুত্ব (Importance of Instructional Objectives)
নির্দেশমূলক উদ্দেশ্য শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়াকে পরিকল্পিত ও কার্যকর করে তোলে।
এর প্রধান গুরুত্বগুলি হলো—
-
পাঠ পরিকল্পনা: শিক্ষককে সঠিকভাবে পাঠ পরিকল্পনা করতে সাহায্য করে।
-
বিষয়বস্তু নির্বাচন: কোন বিষয় শেখানো প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা যায়।
-
শিক্ষণ পদ্ধতি নির্বাচন: উপযুক্ত শিক্ষণ পদ্ধতি ও উপকরণ নির্বাচন করা যায়।
-
শিক্ষার্থীর চাহিদা নির্ধারণ: শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত পার্থক্য ও শিখনের সমস্যা চিহ্নিত করা যায়।
-
শিখনের অগ্রগতি: শিক্ষার্থী কতটা শিখেছে, তা বোঝা যায়।
-
মূল্যায়ন: উপযুক্ত পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি তৈরি করা যায়।
-
শিখন ফলাফল যাচাই: প্রত্যাশিত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জিত হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা যায়।
-
প্রতিকারমূলক শিক্ষণ: কোন শিক্ষার্থীর অতিরিক্ত সাহায্য প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করা যায়।
-
যোগাযোগ: শিক্ষার্থী ও অভিভাবককে শিখনের লক্ষ্য ও অগ্রগতি সম্পর্কে জানানো যায়।
-
শিক্ষণের কার্যকারিতা: শিক্ষক নিজের শিক্ষণ পদ্ধতির সাফল্য যাচাই করতে পারেন।
ব্লুমের শ্রেণিবিন্যাস কী? (What is Bloom's Taxonomy?)
শিক্ষাবিদ বেঞ্জামিন ব্লুম এবং তাঁর সহযোগীরা 1956 সালে শিক্ষার উদ্দেশ্য শ্রেণিবদ্ধ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো প্রকাশ করেন। এটি Bloom's Taxonomy নামে পরিচিত।
মূল শ্রেণিবিন্যাসে শিক্ষার উদ্দেশ্যকে প্রধানত 3টি ক্ষেত্রে ভাগ করা হয়—
-
জ্ঞানমূলক ক্ষেত্র (Cognitive Domain)
-
অনুভূতিমূলক ক্ষেত্র (Affective Domain)
-
মনোসঞ্চালনমূলক ক্ষেত্র (Psychomotor Domain)
এই 3টি ক্ষেত্র যথাক্রমে শিক্ষার্থীর চিন্তা ও জ্ঞান, অনুভূতি ও মূল্যবোধ এবং শারীরিক দক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
পরীক্ষার জন্য মনে রাখবে: মূল জ্ঞানমূলক শ্রেণিবিন্যাস 1956 সালে প্রকাশিত হয়। Anderson ও Krathwohl-এর সংশোধিত জ্ঞানমূলক শ্রেণিবিন্যাস প্রকাশিত হয় 2001 সালে।
সংশোধিত ব্লুমের শ্রেণিবিন্যাস (Revised Bloom's Taxonomy)
Anderson ও Krathwohl 2001 সালে ব্লুমের মূল জ্ঞানমূলক শ্রেণিবিন্যাস সংশোধন করেন। সংশোধিত শ্রেণিবিন্যাসে 6টি স্তর রয়েছে।
স্তরগুলি নিম্ন থেকে উচ্চক্রমে সাজানো হয়েছে—
-
স্মরণ (Remember)
-
বোধগম্যতা (Understand)
-
প্রয়োগ (Apply)
-
বিশ্লেষণ (Analyze)
-
মূল্যায়ন (Evaluate)
-
সৃষ্টি (Create)
এখানে মূল শ্রেণিবিন্যাসের Noun বা বিশেষ্যধর্মী শব্দের পরিবর্তে Verb বা ক্রিয়াপদ ব্যবহার করা হয়েছে। সংশোধিত শ্রেণিবিন্যাসে সর্বোচ্চ স্তর হলো সৃষ্টি (Create)।
1 স্মরণ (Remember)
স্মরণ হলো স্মৃতি থেকে আগে শেখা তথ্য, সংজ্ঞা, সূত্র ও ধারণা মনে করতে পারার ক্ষমতা।
উদাহরণ:
-
পিয়াজের তত্ত্বের নাম বলা।
-
কোনো সংজ্ঞা লেখা।
-
একটি সূত্র মনে করে বলা।
সাধারণ নির্দেশক শব্দ: বলা, চিহ্নিত করা, তালিকাভুক্ত করা, সংজ্ঞা দেওয়া, মনে করা।
2 বোধগম্যতা (Understand)
এই স্তরে শিক্ষার্থী শেখা বিষয়বস্তু নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে বা তার অর্থ বুঝতে পারে।
উদাহরণ:
-
নিজের ভাষায় নির্মিতিবাদের ধারণা ব্যাখ্যা করা।
-
দুটি শিক্ষণ তত্ত্বের মধ্যে মিল খুঁজে বের করা।
-
কোনো ঘটনার কারণ ব্যাখ্যা করা।
নির্দেশক শব্দ: ব্যাখ্যা করা, বর্ণনা করা, উদাহরণ দেওয়া, তুলনা করা, শ্রেণিবদ্ধ করা।
3 প্রয়োগ (Apply)
শিক্ষার্থী অর্জিত জ্ঞানকে নতুন বা বাস্তব পরিস্থিতিতে ব্যবহার করতে পারে।
উদাহরণ:
-
গণিতের সূত্র ব্যবহার করে সমস্যা সমাধান করা।
-
শ্রেণিকক্ষে শেখা শিক্ষণ পদ্ধতি প্রয়োগ করা।
-
আর্কিমিডিসের নীতি ব্যবহার করে কোনো বস্তু জলে ভাসে কেন, তা ব্যাখ্যা করা।
নির্দেশক শব্দ: প্রয়োগ করা, সমাধান করা, প্রদর্শন করা, ব্যবহার করা, সম্পাদন করা।
4 বিশ্লেষণ (Analyze)
এই স্তরে শিক্ষার্থী কোনো বিষয়কে বিভিন্ন অংশে ভাগ করে এবং অংশগুলির মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করে।
উদাহরণ:
-
দুটি শিক্ষণ তত্ত্বের পার্থক্য বিশ্লেষণ করা।
-
শিক্ষার্থীর শিখন সমস্যার সম্ভাব্য কারণ খুঁজে বের করা।
-
কোনো ঘটনার কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক নির্ণয় করা।
নির্দেশক শব্দ: বিশ্লেষণ করা, পৃথক করা, তুলনা করা, সম্পর্ক নির্ণয় করা, সংগঠিত করা।
5 মূল্যায়ন (Evaluate)
এই স্তরে শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট মানদণ্ড বা প্রমাণের ভিত্তিতে কোনো ধারণা, পদ্ধতি বা সিদ্ধান্তের যথার্থতা বিচার করে।
উদাহরণ:
-
কোনো শিক্ষণ পদ্ধতির কার্যকারিতা বিচার করা।
-
প্রমাণের ভিত্তিতে একটি সিদ্ধান্তের যথার্থতা নির্ধারণ করা।
-
দুটি সমাধানের মধ্যে কোনটি ভালো, তা যুক্তিসহ নির্বাচন করা।
নির্দেশক শব্দ: বিচার করা, মূল্যায়ন করা, যুক্তি দেওয়া, সমালোচনা করা, যাচাই করা।
6 সৃষ্টি (Create)
এটি সংশোধিত জ্ঞানমূলক শ্রেণিবিন্যাসের সর্বোচ্চ স্তর। এই স্তরে শিক্ষার্থী বিভিন্ন ধারণা ও তথ্য একত্র করে নতুন কিছু তৈরি করতে পারে।
উদাহরণ:
-
একটি নতুন পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করা।
-
কোনো সমস্যার নতুন সমাধান প্রস্তাব করা।
-
একটি প্রকল্প পরিকল্পনা করা।
-
নতুন শিক্ষণ-উপকরণ তৈরি করা।
নির্দেশক শব্দ: তৈরি করা, পরিকল্পনা করা, নকশা করা, উদ্ভাবন করা, নির্মাণ করা।
সংশোধিত শ্রেণিবিন্যাস মনে রাখার সহজ কৌশল
স্মরণ → বোধ → প্রয়োগ → বিশ্লেষণ → মূল্যায়ন → সৃষ্টি
সহজভাবে মনে রাখবে: প্রথমে তথ্য মনে করতে হয়, তারপর বুঝতে হয়, প্রয়োগ করতে হয়, বিশ্লেষণ করতে হয়, বিচার করতে হয় এবং শেষে নতুন কিছু তৈরি করতে হয়।
তবে বাস্তবে সব ধরনের শিখন সবসময় এই ক্রমে ঘটে না। কাজের প্রকৃতি ও শিক্ষার্থীর পূর্বজ্ঞান অনুযায়ী স্তরের জটিলতা পরিবর্তিত হতে পারে।
জ্ঞানের মাত্রা (Knowledge Dimension)
সংশোধিত Bloom's Taxonomy-তে জ্ঞানের মাত্রাকে 4টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
1 তথ্যসংক্রান্ত জ্ঞান (Factual Knowledge)
কোনো বিষয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় মৌলিক তথ্য, পরিভাষা, সংজ্ঞা ও নির্দিষ্ট বিবরণ জানা।
উদাহরণ: পিয়াজের জ্ঞানীয় বিকাশের 4টি স্তরের নাম জানা।
2 ধারণাসংক্রান্ত জ্ঞান (Conceptual Knowledge)
বিভিন্ন ধারণা, শ্রেণি, নীতি, তত্ত্ব ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কে জানা।
উদাহরণ: পিয়াজের জ্ঞানীয় বিকাশের বিভিন্ন স্তরের বৈশিষ্ট্য বোঝা।
3 পদ্ধতিসংক্রান্ত জ্ঞান (Procedural Knowledge)
কোনো কাজ কীভাবে করতে হয়, তার পদ্ধতি, কৌশল, নিয়ম ও ধাপ সম্পর্কে জানা।
উদাহরণ: একটি শিক্ষণ-শিখন কার্যক্রম কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, তা জানা।
4 অধিজ্ঞানসংক্রান্ত জ্ঞান (Metacognitive Knowledge)
নিজের চিন্তা, শেখার পদ্ধতি, জ্ঞান ও শেখার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকা।
উদাহরণ: কোন পদ্ধতিতে নিজের পড়া ভালো মনে থাকে, তা বুঝতে পারা এবং সেই অনুযায়ী পড়ার পরিকল্পনা করা।
মনে রাখবে: তথ্যসংক্রান্ত, ধারণাসংক্রান্ত, পদ্ধতিসংক্রান্ত এবং অধিজ্ঞানসংক্রান্ত জ্ঞান হলো জ্ঞানের 4টি মাত্রা।
অনুভূতিমূলক ক্ষেত্র (Affective Domain)
অনুভূতিমূলক ক্ষেত্র শিক্ষার্থীর আগ্রহ, অনুভূতি, মনোভাব, মূল্যবোধ ও আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই ক্ষেত্রের শ্রেণিবিন্যাস Bloom-এর সঙ্গে David Krathwohl এবং Bertram Masia-র কাজের মাধ্যমে পরিচিত হয়।
এর 5টি স্তর হলো—
1 গ্রহণ (Receiving)
শিক্ষার্থী কোনো বিষয় বা উদ্দীপকের প্রতি মনোযোগ দেয় এবং তা গ্রহণ করতে আগ্রহ দেখায়।
উদাহরণ: শিক্ষক পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা করলে শিক্ষার্থী মনোযোগ দিয়ে শোনে।
2 প্রতিক্রিয়া (Responding)
শিক্ষার্থী শুধু মনোযোগ দেয় না, বরং আলোচনায় অংশ নেয় বা কোনো কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।
উদাহরণ: শিক্ষার্থী পরিবেশ পরিষ্কার রাখার কাজে অংশ নেয়।
3 মূল্যবোধ গ্রহণ (Valuing)
শিক্ষার্থী কোনো আদর্শ বা মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে এবং তা নিজের আচরণে প্রকাশ করে।
উদাহরণ: শিক্ষার্থী নিয়মিত পরিবেশ পরিষ্কার রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।
4 সংগঠন (Organization)
শিক্ষার্থী বিভিন্ন মূল্যবোধের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে এবং নিজের মূল্যবোধের কাঠামো গড়ে তোলে।
উদাহরণ: পরিবেশ রক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে সম্পর্ক বুঝে নিজের আচরণের নীতি নির্ধারণ করা।
5 চরিত্রায়ন (Characterization)
মূল্যবোধ ও বিশ্বাস শিক্ষার্থীর আচরণের স্থায়ী অংশ হয়ে ওঠে।
উদাহরণ: শিক্ষার্থী নিয়মিত নিজের পরিবেশ পরিষ্কার রাখে এবং অন্যদেরও পরিবেশ সংরক্ষণে উৎসাহিত করে।
মনে রাখার ক্রম: গ্রহণ → প্রতিক্রিয়া → মূল্যবোধ গ্রহণ → সংগঠন → চরিত্রায়ন।
মনোসঞ্চালনমূলক ক্ষেত্র (Psychomotor Domain)
মনোসঞ্চালনমূলক ক্ষেত্র শিক্ষার্থীর শারীরিক দক্ষতা, পেশির সমন্বয়, হাতেকলমে কাজ এবং সঞ্চালনগত দক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই ক্ষেত্রের বিভিন্ন শ্রেণিবিন্যাস বিভিন্ন শিক্ষাবিদ তৈরি করেছেন। Simpson-এর শ্রেণিবিন্যাসে 7টি স্তর রয়েছে।
1 প্রত্যক্ষণ (Perception)
ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে উদ্দীপক শনাক্ত করে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সংকেত বুঝতে পারা।
উদাহরণ: ছবি আঁকার সময় রং ও আকৃতি চিনতে পারা।
2 প্রস্তুতি (Set)
কোনো কাজ করার জন্য মানসিক, শারীরিক ও আবেগগতভাবে প্রস্তুত হওয়া।
উদাহরণ: খেলাধুলার আগে প্রয়োজনীয় ভঙ্গি গ্রহণ করা।
3 নির্দেশিত প্রতিক্রিয়া (Guided Response)
শিক্ষক বা দক্ষ ব্যক্তির নির্দেশনা ও অনুকরণ অনুসারে কোনো কাজ শেখা।
উদাহরণ: শিক্ষকের দেখানো পদ্ধতিতে পরীক্ষাগারের যন্ত্র ব্যবহার করা।
4 যান্ত্রিক দক্ষতা (Mechanism)
অনুশীলনের মাধ্যমে কোনো কাজের মৌলিক দক্ষতা আয়ত্ত করা।
উদাহরণ: নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে সঠিকভাবে টাইপ করা শেখা।
5 জটিল বাহ্যিক প্রতিক্রিয়া (Complex Overt Response)
একাধিক দক্ষতার সমন্বয়ে তুলনামূলকভাবে জটিল কাজ নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করা।
উদাহরণ: কম্পিউটারের বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করে একটি প্রেজেন্টেশন তৈরি করা।
6 অভিযোজন (Adaptation)
পরিস্থিতি অনুযায়ী আগে শেখা দক্ষতার পরিবর্তন বা সামঞ্জস্য সাধন করা।
উদাহরণ: বড় ক্যানভাসে ছবি আঁকার জন্য আগে শেখা কৌশল পরিবর্তন করা।
7 সৃজন (Origination)
আগে শেখা দক্ষতার ভিত্তিতে নতুন সঞ্চালনগত কৌশল বা কাজের পদ্ধতি তৈরি করা।
উদাহরণ: নিজস্ব পদ্ধতিতে নতুন ধরনের নৃত্যভঙ্গি তৈরি করা।
মনে রাখার ক্রম: প্রত্যক্ষণ → প্রস্তুতি → নির্দেশিত প্রতিক্রিয়া → যান্ত্রিক দক্ষতা → জটিল বাহ্যিক প্রতিক্রিয়া → অভিযোজন → সৃজন।
মূল ও সংশোধিত ব্লুমের শ্রেণিবিন্যাসের পার্থক্য
| মূল শ্রেণিবিন্যাস (1956) | সংশোধিত শ্রেণিবিন্যাস (2001) |
|---|---|
| জ্ঞান (Knowledge) | স্মরণ (Remember) |
| বোধগম্যতা (Comprehension) | বোধ (Understand) |
| প্রয়োগ (Application) | প্রয়োগ (Apply) |
| বিশ্লেষণ (Analysis) | বিশ্লেষণ (Analyze) |
| সংশ্লেষণ (Synthesis) | মূল্যায়ন (Evaluate) |
| মূল্যায়ন (Evaluation) | সৃষ্টি (Create) |
মূল শ্রেণিবিন্যাসে সংশ্লেষণ মূল্যায়নের আগে ছিল। সংশোধিত শ্রেণিবিন্যাসে মূল্যায়ন সৃষ্টির আগে অবস্থান করে এবং সৃষ্টি সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে বিবেচিত হয়।
TET ও CTET পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
-
Bloom's Taxonomy মূলত শিক্ষার উদ্দেশ্য শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।
-
Benjamin Bloom-এর মূল জ্ঞানমূলক শ্রেণিবিন্যাস প্রকাশিত হয় 1956 সালে।
-
Anderson ও Krathwohl-এর সংশোধিত শ্রেণিবিন্যাস প্রকাশিত হয় 2001 সালে।
-
সংশোধিত জ্ঞানমূলক শ্রেণিবিন্যাসে 6টি স্তর রয়েছে।
-
সংশোধিত শ্রেণিবিন্যাসে সর্বনিম্ন স্তর হলো স্মরণ (Remember)।
-
সংশোধিত শ্রেণিবিন্যাসে সর্বোচ্চ স্তর হলো সৃষ্টি (Create)।
-
জ্ঞানের মাত্রা 4টি—তথ্য, ধারণা, পদ্ধতি ও অধিজ্ঞান।
-
অনুভূতিমূলক ক্ষেত্রের স্তর 5টি।
-
Simpson-এর মনোসঞ্চালনমূলক শ্রেণিবিন্যাসে স্তর 7টি।
-
নির্দেশমূলক উদ্দেশ্য পাঠ পরিকল্পনা, শিক্ষণ পদ্ধতি নির্বাচন এবং মূল্যায়নে সাহায্য করে।
উপসংহার
ব্লুমের শ্রেণিবিন্যাস শিক্ষককে শিক্ষার্থীর শিখনকে সহজ, পরিকল্পিত ও মূল্যায়নযোগ্য করে তুলতে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীর শুধু তথ্য মুখস্থ করার ক্ষমতা নয়, বরং বোঝা, প্রয়োগ, বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন, সৃজনশীল চিন্তা, মূল্যবোধ এবং ব্যবহারিক দক্ষতার বিকাশ ঘটানো যায়।
তাই Primary TET, Upper Primary TET, CTET এবং অন্যান্য শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার CDP অংশে Bloom's Taxonomy একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
