শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যক্তিগত পার্থক্য এবং শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়ায় এর শিক্ষাগত প্রভাব
Individual Differences among Learners and Educational Implications in Teaching-Learning Process
ব্যক্তিগত পার্থক্যের ধারণা (Concept of Individual Differences)
পৃথিবীর কোনো দুটি মানুষ সম্পূর্ণ একই রকম নয়। একই পরিবারের সন্তানদের মধ্যেও শারীরিক, মানসিক, আবেগীয়, সামাজিক ও শিক্ষাগত ক্ষেত্রে পার্থক্য দেখা যায়। বিদ্যালয়ের একই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যেও কেউ দ্রুত শেখে, কেউ ধীরে শেখে; কেউ সহজে মনে রাখতে পারে, আবার কারও বেশি অনুশীলনের প্রয়োজন হয়।
এই ব্যক্তিভেদে পার্থক্যকেই বলা হয় ব্যক্তিগত পার্থক্য (Individual Differences)।
চার্লস ডারউইন তাঁর বিবর্তনবাদে জীবজগতের মধ্যে বৈচিত্র্যের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর আলোচনায় Like begets like এবং Laws of variation-এর ধারণা পাওয়া যায়। অর্থাৎ একই ধরনের জীব একই ধরনের জীবের জন্ম দিলেও তাদের মধ্যে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য দেখা যায়।
এই বৈচিত্র্য মানুষের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে একই ধরনের ক্ষমতা, আগ্রহ ও শেখার গতি সম্পন্ন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ব্যক্তিগত পার্থক্যের অর্থ (Meaning of Individual Differences)
প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে, যা তাকে অন্য ব্যক্তিদের থেকে পৃথক করে। যেমন—
-
উচ্চতা ও ওজন
-
শারীরিক গঠন
-
স্বভাব ও আচরণ
-
কথা বলার ধরন
-
বুদ্ধি
-
স্মৃতিশক্তি
-
কল্পনা
-
সৃজনশীলতা
-
শেখার গতি
-
আবেগ ও মেজাজ
-
শিক্ষাগত দক্ষতা
একই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এই পার্থক্য দেখা যায়। কেউ একবার বললেই বুঝতে পারে, আবার কারও একই বিষয় বুঝতে বেশি সময় লাগে।
সুতরাং, ব্যক্তির সঙ্গে অন্য ব্যক্তির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের যে পার্থক্য দেখা যায়, তাকে ব্যক্তিগত পার্থক্য বলে।
ব্যক্তিগত পার্থক্যের ধারণার ঐতিহাসিক গুরুত্ব
ব্যক্তিগত পার্থক্যের ধারণা আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও শিক্ষাবিজ্ঞানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই ধারণার স্বীকৃতি প্রাচীন চিন্তাবিদদের লেখাতেও পাওয়া যায়।
Plato, Aristotle এবং Rousseau-এর বিভিন্ন আলোচনায় ব্যক্তিভেদে পার্থক্যের বিষয়টি পাওয়া যায়।
পরবর্তীকালে Galton, Wundt, Cattell, Ebbinghaus এবং Alfred Binet-এর গবেষণায় মানুষের বুদ্ধি, স্মৃতি, মানসিক ক্ষমতা ও সংবেদনশীলতার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পার্থক্যের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।
ব্যক্তিগত পার্থক্যের সংজ্ঞা (Definition of Individual Differences)
সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মধ্যে যে বিভিন্ন ধরনের পার্থক্য দেখা যায়, তাকে ব্যক্তিগত পার্থক্য বলা হয়।
Carter B. Good (1959) তাঁর Dictionary of Education-এ ব্যক্তিগত পার্থক্য সম্পর্কে 2টি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
সংজ্ঞা 1
একটি বা একাধিক বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে ব্যক্তিদের মধ্যে যে পার্থক্য বা বৈচিত্র্য দেখা যায়, তাকে ব্যক্তিগত পার্থক্য বলে।
সংজ্ঞা 2
একজন ব্যক্তিকে অন্য ব্যক্তির থেকে পৃথক করে এমন সমস্ত পার্থক্যের সমষ্টিকে ব্যক্তিগত পার্থক্য বলা হয়।
সহজ সংজ্ঞা
একজন ব্যক্তিকে অন্য ব্যক্তির থেকে পৃথক করে এমন শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, আবেগীয় ও শিক্ষাগত বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যই ব্যক্তিগত পার্থক্য।
ব্যক্তিগত পার্থক্যের শ্রেণিবিভাগ
ব্যক্তিগত পার্থক্যের প্রধান কারণ হিসেবে বংশধারা (Heredity) এবং পরিবেশ (Environment)-এর পারস্পরিক প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যক্তিগত পার্থক্যকে প্রধানত 2 ভাগে আলোচনা করা যায়—
-
অর্জিত পার্থক্য (Acquired Differences)
-
সহজাত পার্থক্য (Innate Differences)
1. অর্জিত পার্থক্য (Acquired Differences)
যেসব পার্থক্য পরিবেশের সঙ্গে ব্যক্তির মিথস্ক্রিয়ার ফলে গড়ে ওঠে এবং জন্মগত নয়, সেগুলিকে অর্জিত পার্থক্য বলা হয়।
অর্জিত পার্থক্য প্রধানত 4 ধরনের—
ক. সামাজিক পার্থক্য
সামাজিক পরিবেশের কারণে যে পার্থক্য তৈরি হয়।
উদাহরণ:
-
আচার-আচরণ
-
স্বভাব-চরিত্র
-
অন্যের সঙ্গে মেলামেশার ক্ষমতা
খ. সাংস্কৃতিক পার্থক্য
সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যের কারণে যে পার্থক্য দেখা যায়।
উদাহরণ:
-
ভাষা
-
রীতিনীতি
-
প্রথা
-
খাদ্যাভ্যাস
-
পোশাক-পরিচ্ছদ
গ. প্রাক্ষোভিক পার্থক্য (Emotional Differences)
আবেগ বা প্রক্ষোভের ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে যে পার্থক্য দেখা যায়।
উদাহরণ:
-
ক্রোধ
-
ভয়
-
আশঙ্কা
-
উদ্বেগ
ঘ. শিক্ষাগত পার্থক্য (Educational Differences)
শিক্ষা ও শিক্ষাগত পারদর্শিতার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যায় তাকে শিক্ষাগত পার্থক্য বলে।
যেমন, একই শ্রেণির কোনো শিক্ষার্থী গণিতে ভালো করতে পারে, আবার অন্য কোনো শিক্ষার্থী ভাষার বিষয়ে বেশি দক্ষ হতে পারে।
2. সহজাত পার্থক্য (Innate Differences)
জিনগত বা বংশগত কারণে যে পার্থক্য দেখা যায়, তাকে সহজাত পার্থক্য বলা হয়।
এটি প্রধানত 3 ধরনের—
-
দৈহিক পার্থক্য
-
মানসিক পার্থক্য
-
মেজাজগত পার্থক্য
ক. দৈহিক পার্থক্য
মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পার্থক্য দেখা যায়।
যেমন—
-
উচ্চতা
-
ওজন
-
মুখের গঠন
-
গলার স্বর
-
হাঁটার ধরন
-
শারীরিক গঠন
খ. মানসিক পার্থক্য
মানসিক ক্ষমতার ক্ষেত্রেও ব্যক্তি বিশেষে পার্থক্য দেখা যায়।
যেমন—
-
বুদ্ধি
-
স্মৃতিশক্তি
-
কল্পনা
-
সৃজনশীলতা
-
মানসিক প্রবণতা
গ. মেজাজগত পার্থক্য
ব্যক্তির মেজাজ ও আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রেও পার্থক্য দেখা যায়।
যেমন—
-
কেউ অল্পতেই রেগে যায়।
-
কেউ শান্ত প্রকৃতির।
-
কেউ সহজে উদ্বিগ্ন হয়।
-
কেউ তুলনামূলকভাবে ধীরস্থির।
পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন:
সহজাত পার্থক্য = দৈহিক + মানসিক + মেজাজগত
ব্যক্তিগত পার্থক্য ও বংশধারা (Individual Differences and Heredity)
বংশধারা (Heredity) বলতে পিতামাতা ও পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সমষ্টিকে বোঝায়।
Douglass এবং Holland (1947)-এর মতে, বংশধারার মাধ্যমে ব্যক্তি পিতামাতা ও পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে দৈহিক গঠন, শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং বিভিন্ন ক্ষমতা পেতে পারে।
ব্যক্তিগত পার্থক্যের ক্ষেত্রে বংশধারার ভূমিকা
বংশধারা ব্যক্তির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
1. শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণ
উৎসের আলোচনায় বলা হয়েছে, মানুষের 23 জোড়া ক্রোমোজোমের মধ্যে 1 জোড়া sex chromosome হিসেবে কাজ করে।
-
XX → কন্যা
-
XY → পুত্র
মাতার ডিম্বাণু X chromosome বহন করে এবং পিতার শুক্রাণু X বা Y chromosome বহন করতে পারে। তাই এই উৎসের কাঠামো অনুযায়ী শিশুর sex নির্ধারণে পিতার chromosome-এর ভূমিকা থাকে।
2. দৈহিক বৈশিষ্ট্য
বংশধারার সঙ্গে বিভিন্ন শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক রয়েছে।
যেমন—
-
চোখের রং
-
গায়ের রং
-
উচ্চতা
-
মুখের গঠন
-
রক্তের গ্রুপ
-
আঙুলের ছাপ
3. মানসিক বৈশিষ্ট্য
বুদ্ধি, মানসিক প্রবণতা, কল্পনা ও সৃজনশীলতার মতো বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রেও বংশধারার প্রভাবের কথা আলোচিত হয়।
4. প্রাক্ষোভিক বৈশিষ্ট্য
মেজাজ, ক্রোধ ও দুশ্চিন্তার মতো আবেগীয় বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রেও বংশগত প্রভাব থাকতে পারে।
একই পিতামাতার সন্তান একই রকম হয় না কেন?
একই পিতামাতার সন্তানদের মধ্যেও ব্যক্তিগত পার্থক্য দেখা যায়। এর একটি কারণ হল জিনের বিভিন্ন সমন্বয়।
উৎসে Chance বা আকস্মিক জিনগত সমন্বয়ের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া সন্তান কেবল পিতামাতার বৈশিষ্ট্যই নয়, পূর্বপুরুষদের বৈশিষ্ট্যও জিনের মাধ্যমে পেতে পারে।
তাই একই পরিবারের সন্তানদের মধ্যেও বুদ্ধি, চেহারা, স্বভাব ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য দেখা যায়।
ব্যক্তিগত পার্থক্য ও পরিবেশ
Environment বা পরিবেশ বলতে শুধু ব্যক্তির চারপাশে থাকা বিষয়গুলিকে বোঝায় না। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ব্যক্তি ও পরিবেশের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া (Interaction) এবং ব্যক্তির আচরণে তার প্রভাব থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর ব্যক্তিগত বিকাশে পরিবেশের প্রভাব 2ভাবে আলোচনা করা যায়—
-
অভ্যন্তরীণ পরিবেশ (Internal Environment)
-
বাহ্যিক পরিবেশ (External Environment)
1. অভ্যন্তরীণ পরিবেশ (Internal Environment)
শিশুর জন্মের আগে গর্ভকালীন পরিবেশকে এখানে অভ্যন্তরীণ পরিবেশ বলা হয়েছে।
মায়ের—
-
খাদ্যাভ্যাস
-
শারীরিক সুস্থতা
-
মানসিক সুস্থতা
-
মানসিক চাপ
-
গর্ভকালীন যত্ন
ইত্যাদি শিশুর বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
এছাড়া প্রসবের সময়ের বিভিন্ন পরিস্থিতিও শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
2. বাহ্যিক পরিবেশ (External Environment)
জন্মের পর শিশুর যে পরিবেশের সঙ্গে নিয়মিত মিথস্ক্রিয়া হয়, তাকে বাহ্যিক পরিবেশ বলা হয়।
বাহ্যিক পরিবেশকে প্রধানত 2 ভাগে দেখা যায়—
-
প্রাকৃতিক বা ভৌত পরিবেশ (Physical Environment)
-
সমাজ-সাংস্কৃতিক পরিবেশ (Socio-cultural Environment)
ক. প্রাকৃতিক বা ভৌত পরিবেশ
প্রাকৃতিক পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান মানুষের জীবনযাত্রা ও বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।
যেমন—
-
জলবায়ু
-
ভৌগোলিক অবস্থান
-
পরিবেশের প্রকৃতি
-
জীবনযাপনের সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা
এই পরিবেশের পার্থক্যের ফলে মানুষের দৈহিক বৈশিষ্ট্য ও জীবনযাত্রায় পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
খ. সমাজ-সাংস্কৃতিক পরিবেশ
পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ, ভাষা, সাহিত্য, শিল্পকলা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ব্যক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
একজন শিক্ষার্থী যে পরিবার ও সমাজে বড় হয়, তার—
-
ভাষা
-
আচরণ
-
মূল্যবোধ
-
সামাজিক দক্ষতা
-
শেখার অভ্যাস
-
অভিযোজন ক্ষমতা
ইত্যাদিতে সেই পরিবেশের প্রভাব দেখা যেতে পারে।
বংশধারা ও পরিবেশের আপেক্ষিক প্রভাব
ব্যক্তিগত পার্থক্যের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—বংশধারা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, নাকি পরিবেশ?
এ বিষয়ে মনোবিজ্ঞানে বিভিন্ন মত পাওয়া যায়।
1. বংশধারাবাদী মত
বংশধারাবাদীরা ব্যক্তির বিকাশে Heredity-কে বেশি গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, বংশধারায় পাওয়া বৈশিষ্ট্য ব্যক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
2. পরিবেশবাদী মত
পরিবেশবাদীরা ব্যক্তির বিকাশে Environment-কে বেশি গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ ব্যক্তির বিকাশকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
Watson-এর বিখ্যাত বক্তব্য এই পরিবেশবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যুক্ত—
“Give me a healthy child. I will make him what I desire.”
অর্থাৎ উপযুক্ত পরিবেশ পেলে শিশুকে বিভিন্নভাবে গড়ে তোলা সম্ভব—এই ধারণাকে এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
3. বংশধারা ও পরিবেশের সমন্বিত মত
বর্তমান আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হল—বংশধারা ও পরিবেশকে আলাদা করে দেখা যায় না।
ব্যক্তির বিকাশে উভয়ের মিথস্ক্রিয়া কাজ করে।
Woodworth এবং Marquis-এর ধারণা অনুযায়ী—
ব্যক্তি = বংশধারা × পরিবেশ
অর্থাৎ ব্যক্তি শুধু বংশধারার ফল নয় এবং শুধু পরিবেশের ফলও নয়। বংশধারা ও পরিবেশ পরস্পরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে ব্যক্তির বিকাশে ভূমিকা রাখে।
এটি বোঝাতে আয়তক্ষেত্রের উদাহরণ ব্যবহার করা যায়।
আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল = দৈর্ঘ্য × প্রস্থ
একইভাবে—
ব্যক্তির বিকাশ = বংশধারা × পরিবেশ
শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত পার্থক্যের শিক্ষাগত প্রভাব
শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পার্থক্যের ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই শ্রেণির সব শিক্ষার্থী একইভাবে শেখে না।
একজন শিক্ষককে তাই শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত পার্থক্য বিবেচনা করে শিক্ষণ পদ্ধতি নির্বাচন করতে হয়।
শিক্ষাগত গুরুত্বপূর্ণ দিক
-
শিক্ষার্থীর ক্ষমতা অনুযায়ী শিক্ষাদান
শিক্ষার্থীদের বুদ্ধি, আগ্রহ ও শেখার গতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। -
শিক্ষণ পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য
সব শিক্ষার্থীর জন্য একই পদ্ধতি সবসময় কার্যকর নাও হতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন শিক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত। -
শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত চাহিদা বোঝা
কোনো শিক্ষার্থী দ্রুত বুঝতে পারে, আবার অন্য শিক্ষার্থীর বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে। -
ব্যক্তিভিত্তিক সহায়তা
যেসব শিক্ষার্থীর কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে অসুবিধা রয়েছে, তাদের অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। -
আগ্রহের প্রতি গুরুত্ব
শিক্ষার্থীর আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে শেখানো হলে শেখার আগ্রহ বৃদ্ধি পেতে পারে। -
বৈচিত্র্যকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ
শিক্ষার্থীদের মধ্যে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তাই শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের তুলনা না করে প্রত্যেকের নিজস্ব ক্ষমতা ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
TET ও CTET পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
| বিষয় | মনে রাখুন |
|---|---|
| Individual Difference | ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য |
| প্রধান ভিত্তি | বংশধারা ও পরিবেশ |
| Acquired Difference | সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রাক্ষোভিক, শিক্ষাগত |
| Innate Difference | দৈহিক, মানসিক, মেজাজগত |
| Heredity | পিতামাতা ও পূর্বপুরুষ থেকে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্য |
| Internal Environment | গর্ভকালীন পরিবেশ |
| External Environment | জন্মের পরের পরিবেশ |
| Physical Environment | প্রাকৃতিক/ভৌত পরিবেশ |
| Socio-cultural Environment | পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ, ভাষা, সংস্কৃতি |
| Watson | পরিবেশবাদী মতের সঙ্গে যুক্ত |
| Woodworth & Marquis | Heredity × Environment |
পরীক্ষার জন্য সহজে মনে রাখুন
অর্জিত পার্থক্য
সা-সাং-প্রা-শি
-
সা = সামাজিক
-
সাং = সাংস্কৃতিক
-
প্রা = প্রাক্ষোভিক
-
শি = শিক্ষাগত
সহজাত পার্থক্য
দৈ-মান-মে
-
দৈ = দৈহিক
-
মান = মানসিক
-
মে = মেজাজগত
পরিবেশ
অভ্যন্তরীণ + বাহ্যিক
বাহ্যিক পরিবেশ → প্রাকৃতিক + সমাজ-সাংস্কৃতিক
উপসংহার
ব্যক্তিগত পার্থক্য (Individual Differences) শিক্ষাবিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর বুদ্ধি, স্মৃতি, আগ্রহ, সৃজনশীলতা, আবেগ, শেখার গতি এবং সামাজিক আচরণ এক নয়। তাই শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের এই বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ব্যক্তিগত পার্থক্য মূলত বংশধারা ও পরিবেশের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই একজন শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পার্থক্যকে সমস্যা হিসেবে না দেখে শিক্ষণ পরিকল্পনার একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
TET, CTET, Primary TET ও Upper Primary TET পরীক্ষার জন্য বিশেষভাবে মনে রাখুন:
Individual Difference = Heredity + Environment-এর পারস্পরিক প্রভাব।
