শিখনের তত্ত্বের ধারণা (Concept of Learning Theories)
শিখন কীভাবে ঘটে এবং কোন প্রক্রিয়ায় মানুষ নতুন জ্ঞান, দক্ষতা, অভ্যাস ও আচরণ অর্জন করে, তার ব্যাখ্যাকে শিখনের তত্ত্ব (Theories of Learning) বলা হয়।
শিখনের বিভিন্ন তত্ত্বের সাহায্যে শিক্ষক বুঝতে পারেন, শিক্ষার্থীরা কীভাবে শেখে এবং কীভাবে তাদের শিখনকে আরও কার্যকর করা যায়।
শিখনের প্রধান তত্ত্বসমূহ
শিখনের তত্ত্বগুলিকে প্রধানত কয়েকটি ভাগে আলোচনা করা যায়।
1. সংযোগমূলক বা আচরণমূলক তত্ত্ব (Associationistic or Behaviouristic Theory)
-
থর্নডাইকের সংযোজনবাদ বা চেষ্টা ও ভ্রান্তি তত্ত্ব
-
গাথরির সংলগ্নতার তত্ত্ব
-
প্যাভলভের প্রাচীন অনুবর্তন তত্ত্ব
-
স্কিনারের সক্রিয় অনুবর্তন তত্ত্ব
-
হালের তত্ত্ব
2. প্রজ্ঞামূলক বা সমগ্রতাবাদী তত্ত্ব (Cognitive or Gestalt Approach)
-
গেস্টাল্ট তত্ত্ব
-
লিউইনের ফিল্ড তত্ত্ব
-
আসুবেলের বাচনিক শিখন তত্ত্ব
-
টলম্যানের চিহ্ন গেস্টাল্ট তত্ত্ব
-
ব্রুনারের তত্ত্ব
-
বান্দুরার সামাজিক জ্ঞানমূলক তত্ত্ব
3. নির্মিতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি (Constructivist Approach)
4. মানবতাবাদী তত্ত্ব (Humanistic Theory)
-
মাসলোর তত্ত্ব
-
কুম্বসের তত্ত্ব
-
কার্ল রজার্সের তত্ত্ব
1. থর্নডাইকের সংযোজনবাদ বা চেষ্টা ও ভ্রান্তি তত্ত্ব (Thorndike’s Connectionism or Trial and Error Theory)
প্রবক্তা
এডওয়ার্ড লি থর্নডাইক (E. L. Thorndike)
থর্নডাইক বিভিন্ন প্রাণীর শিখন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। তাঁর মতে, শিখন হলো উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের প্রক্রিয়া।
এখানে—
-
উদ্দীপক (Stimulus): যে বিষয় বা পরিস্থিতি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
-
প্রতিক্রিয়া (Response): উদ্দীপকের ফলে ব্যক্তি বা প্রাণীর আচরণ।
-
S-R Bond: Stimulus ও Response-এর মধ্যে সংযোগ।
উদাহরণ
একজন শিক্ষার্থী একটি গাণিতিক সমস্যা সমাধান করার সময় প্রথমে ভুল সূত্র প্রয়োগ করতে পারে। বারবার চেষ্টা করার পর সে সঠিক সূত্রটি প্রয়োগ করে সমস্যার সমাধান করতে শেখে।
এভাবে চেষ্টা ও ভুলের মধ্য দিয়ে সঠিক প্রতিক্রিয়া শেখার প্রক্রিয়াকে চেষ্টা ও ভ্রান্তি তত্ত্ব (Trial and Error Theory) বলা হয়।
থর্নডাইকের শিখনের প্রধান সূত্র (Major Laws of Learning)
থর্নডাইক শিখনের 3টি প্রধান সূত্রের কথা বলেছেন।
1. প্রস্তুতির সূত্র (Law of Readiness)
শেখার জন্য শিক্ষার্থীর শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন।
উদাহরণ: শিক্ষার্থী যখন কোনো বিষয় শেখার জন্য আগ্রহী ও প্রস্তুত থাকে, তখন তার পক্ষে বিষয়টি শেখা সহজ হয়।
শিক্ষাগত তাৎপর্য:
-
পাঠদানের আগে শিক্ষার্থীর আগ্রহ তৈরি করতে হবে।
-
শিক্ষার্থীর বয়স ও মানসিক স্তর অনুযায়ী পাঠদান করতে হবে।
-
শেখার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
2. ফলভোগের সূত্র (Law of Effect)
কোনো কাজের ফল আনন্দদায়ক বা সন্তোষজনক হলে সেই কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিক্রিয়া শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে, অসন্তোষজনক ফল প্রতিক্রিয়ার সংযোগকে দুর্বল করতে পারে।
উদাহরণ: ভালো উত্তর দেওয়ার জন্য শিক্ষকের প্রশংসা পেলে শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
শিক্ষাগত তাৎপর্য:
-
শিক্ষার্থীর ভালো কাজের প্রশংসা করা উচিত।
-
শেখার অভিজ্ঞতাকে আনন্দদায়ক করতে হবে।
-
শিক্ষার্থীর সাফল্যকে উৎসাহিত করতে হবে।
3. অনুশীলনের সূত্র (Law of Exercise)
অনুশীলনের মাধ্যমে শিখন দৃঢ় হয়। এই সূত্রের 2টি ভাগ রয়েছে।
ক. ব্যবহারের সূত্র (Law of Use): কোনো সংযোগ নিয়মিত ব্যবহার বা অনুশীলন করলে তা শক্তিশালী হয়।
খ. অব্যবহারের সূত্র (Law of Disuse): কোনো সংযোগ দীর্ঘদিন ব্যবহার না করলে তা দুর্বল হতে পারে।
উদাহরণ: নিয়মিত অঙ্ক অনুশীলন করলে অঙ্ক করার দক্ষতা বাড়ে।
শিক্ষাগত তাৎপর্য:
-
নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ দিতে হবে।
-
শেখা বিষয় বারবার পুনরাবৃত্তি করাতে হবে।
-
পূর্বে শেখা বিষয় নতুন পাঠের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
থর্নডাইকের গৌণ সূত্র (Minor Laws of Learning)
থর্নডাইক কয়েকটি গৌণ সূত্রের কথাও বলেছেন।
1. বহুমুখী প্রতিক্রিয়ার সূত্র (Law of Multiple Response): সঠিক প্রতিক্রিয়া খুঁজে পাওয়ার আগে শিক্ষার্থী বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা করতে পারে।
শিক্ষাগত তাৎপর্য: শিক্ষার্থীর প্রাথমিক ভুলকে শেখার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখতে হবে। তাকে সঠিক উত্তর খুঁজে পেতে সাহায্য করতে হবে।
2. মানসিক প্রস্তুতি বা মনোভাবের সূত্র (Law of Mental Set or Attitude): শিক্ষার্থীর আগ্রহ, অনুভূতি ও মনোভাব শিখনে প্রভাব ফেলে।
শিক্ষাগত তাৎপর্য: পাঠদানের আগে শিক্ষার্থীর মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করা প্রয়োজন।
3. আংশিক ক্রিয়ার সূত্র (Law of Partial Activity): জটিল সমস্যার সমাধানের জন্য শিক্ষার্থী সমস্যার নির্দিষ্ট অংশের দিকে মনোযোগ দিতে পারে।
শিক্ষাগত তাৎপর্য: জটিল বিষয়কে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে শেখানো উচিত।
4. উপমান বা আত্মীকরণের সূত্র (Law of Assimilation): পূর্বের অভিজ্ঞতার সাহায্যে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সহজ হয়।
শিক্ষাগত তাৎপর্য: নতুন পাঠকে শিক্ষার্থীর পূর্বজ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
5. অনুষঙ্গমূলক সঞ্চালনের সূত্র (Law of Associative Shifting): একটি উদ্দীপকের সঙ্গে যুক্ত প্রতিক্রিয়া ধীরে ধীরে অন্য উদ্দীপকের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
শিক্ষাগত তাৎপর্য: উপযুক্ত অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মধ্যে ভালো অভ্যাস গড়ে তোলা যায়।
থর্নডাইকের তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ MCQ তথ্য
-
প্রবক্তা: E. L. Thorndike
-
তত্ত্বের নাম: Connectionism বা Trial and Error Theory
-
শিখনের ভিত্তি: উদ্দীপক-প্রতিক্রিয়ার সংযোগ (S-R Bond)
-
প্রধান সূত্র: 3টি
-
প্রধান সূত্রগুলি: প্রস্তুতি, ফলভোগ ও অনুশীলন
2. প্রাচীন অনুবর্তন তত্ত্ব (Classical Conditioning Theory)
প্রবক্তা
ইভান প্যাভলভ (Ivan Pavlov)
প্যাভলভ ছিলেন একজন রাশিয়ান শারীরতত্ত্ববিদ। তাঁর প্রাচীন অনুবর্তন তত্ত্বে দেখানো হয়, নিরপেক্ষ উদ্দীপককে উপযুক্তভাবে স্বাভাবিক উদ্দীপকের সঙ্গে বারবার যুক্ত করলে নিরপেক্ষ উদ্দীপকও একটি নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
প্যাভলভের কুকুরের পরীক্ষা
প্যাভলভ ক্ষুধার্ত কুকুরকে খাবার দেওয়ার সময় ঘণ্টা বাজাতেন। খাবার দেখে কুকুরের মুখে স্বাভাবিকভাবে লালা নিঃসরণ হতো।
এই প্রক্রিয়া বারবার ঘটানোর পর দেখা গেল, শুধু ঘণ্টার শব্দ শুনেও কুকুরের মুখে লালা নিঃসরণ হচ্ছে।
অর্থাৎ, ঘণ্টার শব্দের সঙ্গে খাবারের সম্পর্ক তৈরি হওয়ায় ঘণ্টার শব্দটি লালা নিঃসরণের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে শিখেছিল।
প্রাচীন অনুবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা
1. স্বাভাবিক উদ্দীপক (Unconditioned Stimulus বা UCS): যে উদ্দীপক স্বাভাবিকভাবে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
উদাহরণ: খাবার।
2. স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া (Unconditioned Response বা UCR): স্বাভাবিক উদ্দীপকের ফলে যে প্রতিক্রিয়া ঘটে।
উদাহরণ: খাবার দেখে কুকুরের লালা নিঃসরণ।
3. নিরপেক্ষ উদ্দীপক (Neutral Stimulus): অনুবর্তন তৈরির আগে যে উদ্দীপক নির্দিষ্ট স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না।
উদাহরণ: পরীক্ষার শুরুতে ঘণ্টার শব্দ।
4. অনুবর্তিত উদ্দীপক (Conditioned Stimulus বা CS): অনুবর্তন তৈরি হওয়ার পরে যে উদ্দীপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
উদাহরণ: খাবারের সঙ্গে বারবার যুক্ত হওয়ার পর ঘণ্টার শব্দ।
5. অনুবর্তিত প্রতিক্রিয়া (Conditioned Response বা CR): অনুবর্তিত উদ্দীপকের ফলে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া।
উদাহরণ: শুধু ঘণ্টার শব্দ শুনে কুকুরের লালা নিঃসরণ।
প্রাচীন অনুবর্তনের বৈশিষ্ট্য
-
নিরপেক্ষ উদ্দীপককে স্বাভাবিক উদ্দীপকের সঙ্গে উপযুক্ত ক্রমে যুক্ত করতে হয়।
-
উদ্দীপকগুলিকে বারবার উপস্থাপন করতে হয়।
-
উদ্দীপকগুলির মধ্যে উপযুক্ত সময়ের সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন।
-
অনুবর্তনের ফলে নতুন উদ্দীপক একটি নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাচীন অনুবর্তনের প্রয়োগ
1. ভালো অভ্যাস গঠন: পরিচ্ছন্নতা, সময়ানুবর্তিতা ও নিয়ম মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
2. ভয় ও উদ্বেগ কমানো: উপযুক্ত পদ্ধতিতে ভয় বা উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত নেতিবাচক অভিজ্ঞতা পরিবর্তনে সাহায্য করতে পারে।
3. ইতিবাচক মনোভাব গঠন: বিদ্যালয় ও শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীর ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ থাকতে পারে।
4. অক্ষর ও সংখ্যা শেখানো: ছবি, বস্তু ও পরিচিত অভিজ্ঞতার সঙ্গে অক্ষর বা সংখ্যাকে যুক্ত করে শেখানো যায়।
5. প্রাণীদের প্রশিক্ষণ: প্রাণীদের নির্দিষ্ট উদ্দীপকের সঙ্গে নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া যুক্ত করতে এই নীতির প্রয়োগ দেখা যায়।
প্রাচীন অনুবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ MCQ তথ্য
-
প্রবক্তা: Ivan Pavlov
-
পরীক্ষার প্রাণী: কুকুর
-
প্রধান ধারণা: উদ্দীপকের মধ্যে সংযোগ স্থাপন
-
প্রতিক্রিয়ার ধরন: সাধারণত স্বয়ংক্রিয় বা প্রতিবর্তধর্মী প্রতিক্রিয়া
-
গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ: ঘণ্টার শব্দে কুকুরের লালা নিঃসরণ
3. সক্রিয় অনুবর্তন তত্ত্ব (Operant Conditioning Theory)
প্রবক্তা
বি. এফ. স্কিনার (B. F. Skinner)
স্কিনারের সক্রিয় অনুবর্তন তত্ত্ব অনুসারে, আচরণের ফলাফল ভবিষ্যতে সেই আচরণের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে।
কোনো আচরণের পরে এমন ফল পাওয়া গেলে যা সেই আচরণকে শক্তিশালী করে, তাহলে ভবিষ্যতে ওই আচরণটি আবার ঘটার সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
সক্রিয় অনুবর্তনের উদাহরণ
একজন শিক্ষার্থী নিয়মিত বাড়ির কাজ সম্পূর্ণ করে। শিক্ষক তার কাজের প্রশংসা করেন। প্রশংসা পেয়ে শিক্ষার্থী ভবিষ্যতেও নিয়মিত বাড়ির কাজ করতে উৎসাহিত হতে পারে।
এখানে প্রশংসা শিক্ষার্থীর কাঙ্ক্ষিত আচরণকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করছে।
স্কিনারের মতে আচরণের প্রকারভেদ
1. রেসপন্ডেন্ট আচরণ (Respondent Behaviour): নির্দিষ্ট উদ্দীপকের ফলে যে আচরণ ঘটে।
উদাহরণ: উজ্জ্বল আলোতে চোখের মণির প্রতিক্রিয়া।
2. অপারেন্ট আচরণ (Operant Behaviour): যে আচরণ পরিবেশের সঙ্গে ব্যক্তির সক্রিয়তার মাধ্যমে ঘটে এবং যার পুনরাবৃত্তি আচরণের ফল দ্বারা প্রভাবিত হয়।
উদাহরণ: প্রশংসা পাওয়ার আশায় শিক্ষার্থীর নিয়মিত পড়াশোনা করা।
সক্রিয় অনুবর্তনের প্রধান ধারণা
1. শক্তিদান (Reinforcement)
শক্তিদান এমন একটি প্রক্রিয়া, যা কোনো আচরণের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা বাড়ায়।
ক. ধনাত্মক শক্তিদান (Positive Reinforcement): কাঙ্ক্ষিত আচরণের পরে পছন্দসই কিছু দেওয়া হয়, ফলে আচরণটি পুনরায় ঘটার সম্ভাবনা বাড়ে।
উদাহরণ: ভালো কাজের জন্য শিক্ষার্থীকে প্রশংসা করা।
খ. ঋণাত্মক শক্তিদান (Negative Reinforcement): কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি দূর করা বা এড়ানোর ফলে আচরণটির পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা বাড়ে।
উদাহরণ: নিয়মিত কাজ সম্পূর্ণ করার ফলে অতিরিক্ত অনুশীলনের প্রয়োজন না থাকা।
মনে রাখবে: ঋণাত্মক শক্তিদান এবং শাস্তি এক বিষয় নয়। শক্তিদান আচরণ বাড়ায়, আর শাস্তির উদ্দেশ্য হলো কোনো আচরণ কমানো।
2. শাস্তি (Punishment)
শাস্তি এমন একটি পরিণাম, যার ফলে কোনো আচরণের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা কমে।
উদাহরণ: নিয়ম ভাঙার পরে উপযুক্ত পরিণাম ঘটলে শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে নিয়ম ভাঙার আচরণ কমাতে পারে।
3. আচরণের রূপদান (Shaping)
কোনো জটিল বা নতুন আচরণ শেখানোর জন্য আচরণের ছোট ছোট ধাপকে ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী করার প্রক্রিয়াকে Shaping বলে।
উদাহরণ: শিক্ষার্থীকে জটিল অঙ্ক শেখানোর সময় প্রথমে সহজ ধাপ শেখানো হয়। প্রতিটি ধাপে সাফল্যের পরে উৎসাহ দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ অঙ্কটি করতে শেখে।
শিক্ষাক্ষেত্রে সক্রিয় অনুবর্তনের প্রয়োগ
-
শিক্ষার্থীর ভালো আচরণকে উৎসাহিত করা।
-
পুরস্কার ও প্রশংসার সাহায্যে শেখার আগ্রহ বাড়ানো।
-
অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ সংশোধনে সাহায্য করা।
-
জটিল বিষয়কে ছোট ছোট ধাপে শেখানো।
-
শিক্ষার্থীর সাফল্য সম্পর্কে দ্রুত প্রতিক্রিয়া বা Feedback দেওয়া।
-
শিক্ষার্থীর ক্ষমতা ও শেখার গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠদান করা।
-
প্রোগ্রামড লার্নিং (Programmed Learning) এবং টিচিং মেশিন (Teaching Machine)-এর ধারণা প্রয়োগ করা।
প্রোগ্রামড লার্নিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য
-
পাঠ্যবিষয়কে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা হয়।
-
শিক্ষার্থী ধাপে ধাপে শেখে।
-
শিক্ষার্থী নিজের গতিতে এগোতে পারে।
-
প্রতিক্রিয়া বা Feedback দেওয়া হয়।
-
সঠিক উত্তরের মাধ্যমে শিখনকে শক্তিশালী করা হয়।
সক্রিয় অনুবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ MCQ তথ্য
-
প্রবক্তা: B. F. Skinner
-
মূল ধারণা: আচরণের ফলাফল ও শক্তিদান
-
গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা: Reinforcement, Punishment, Shaping
-
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োগ: আচরণ সংশোধন, প্রোগ্রামড লার্নিং ও টিচিং মেশিন
4. প্রাচীন অনুবর্তন ও সক্রিয় অনুবর্তনের পার্থক্য
| পার্থক্যের বিষয় | প্রাচীন অনুবর্তন | সক্রিয় অনুবর্তন |
|---|---|---|
| প্রবক্তা | Ivan Pavlov | B. F. Skinner |
| প্রধান ধারণা | উদ্দীপকের মধ্যে সংযোগ | আচরণ ও তার ফলাফলের সম্পর্ক |
| আচরণের ধরন | সাধারণত স্বয়ংক্রিয় বা প্রতিবর্তধর্মী | সাধারণত সক্রিয় আচরণ |
| গুরুত্বপূর্ণ বিষয় | উদ্দীপকের সঙ্গে উদ্দীপকের সংযোগ | আচরণের পরে শক্তিদান বা অন্য পরিণাম |
| প্রধান প্রক্রিয়া | নিরপেক্ষ উদ্দীপক অনুবর্তিত উদ্দীপকে পরিণত হয় | আচরণের ফল ভবিষ্যৎ আচরণকে প্রভাবিত করে |
| উদাহরণ | ঘণ্টার শব্দে কুকুরের লালা নিঃসরণ | প্রশংসা পেয়ে শিক্ষার্থীর নিয়মিত পড়াশোনা |
MCQ টিপস: Pavlov-এর সঙ্গে Classical Conditioning এবং Skinner-এর সঙ্গে Operant Conditioning মিলিয়ে মনে রাখবে।
5. গেস্টাল্ট তত্ত্ব বা সমগ্রতাবাদী তত্ত্ব (Gestalt Theory of Learning)
প্রধান প্রবক্তা
-
ম্যাক্স ওয়ার্দিমার (Max Wertheimer)
-
কার্ট কফকা (Kurt Koffka)
-
উলফগ্যাং কোহলার (Wolfgang Köhler)
‘Gestalt’ একটি জার্মান শব্দ। এর অর্থ গঠন, কাঠামো বা সামগ্রিক রূপ।
গেস্টাল্ট তত্ত্ব অনুসারে, কোনো বিষয়কে শুধু বিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে না দেখে তার সামগ্রিক রূপ ও অংশগুলির পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
উদাহরণ
একজন শিক্ষার্থী একটি গাণিতিক সমস্যার প্রতিটি তথ্য আলাদাভাবে মুখস্থ না করে, তথ্যগুলির মধ্যে সম্পর্ক বুঝে সমস্যাটির সমাধান করতে পারে। এভাবে সামগ্রিক পরিস্থিতি বুঝে সমাধানে পৌঁছানো গেস্টাল্ট দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সম্পর্কিত।
গেস্টাল্টের সংগঠনমূলক নীতি
1. বিচ্ছিন্নকরণের নীতি
কোনো বৃহৎ সংগঠনের মধ্যে থেকে নির্দিষ্ট অংশকে আলাদা করে চিনতে পারা।
উদাহরণ: আকাশের অসংখ্য তারার মধ্যে কয়েকটি তারাকে আলাদা করে একটি নক্ষত্রমণ্ডল হিসেবে চেনা।
2. সাদৃশ্যের নীতি (Principle of Similarity)
সদৃশ বস্তু বা ধারণাগুলিকে আমরা সহজে একসঙ্গে সংগঠিত করতে পারি।
উদাহরণ: একই রকম আকারের বা একই বৈশিষ্ট্যের বস্তুগুলিকে একটি দলে সাজানো।
3. নৈকট্যের নীতি (Principle of Proximity)
স্থান বা সময়ের দিক থেকে কাছাকাছি থাকা বিষয়গুলিকে আমরা সহজে একসঙ্গে সংগঠিত করি।
উদাহরণ: পাশাপাশি থাকা বিন্দুগুলিকে একটি গোষ্ঠী হিসেবে দেখা।
4. ধারাবাহিকতার নীতি (Principle of Continuity)
যেসব রেখা, বস্তু বা ধারণার মধ্যে ধারাবাহিকতা রয়েছে, সেগুলিকে আমরা একটি ধারাবাহিক সংগঠন হিসেবে দেখতে চাই।
5. পূর্বজ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্য
পূর্বে শেখা বিষয় নতুন বিষয় বুঝতে সাহায্য করে।
উদাহরণ: বৃত্তের ব্যাস ও ব্যাসার্ধ সম্পর্কে জ্ঞান থাকলে বৃত্তের ক্ষেত্রফল শেখা সহজ হয়।
শিক্ষাক্ষেত্রে গেস্টাল্ট তত্ত্বের গুরুত্ব
-
শিক্ষার্থীদের বিষয়বস্তুর সামগ্রিক ধারণা দিতে হবে।
-
নতুন পাঠকে পূর্বজ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
-
মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে বিষয়বস্তুর পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করতে হবে।
-
জটিল সমস্যাকে সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করার সুযোগ দিতে হবে।
-
শিক্ষার্থীদের নিজে চিন্তা করে সমস্যার সমাধান করতে উৎসাহিত করতে হবে।
গেস্টাল্ট তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ MCQ তথ্য
-
Gestalt শব্দের অর্থ: গঠন বা সামগ্রিক রূপ
-
প্রধান প্রবক্তা: Wertheimer, Koffka ও Köhler
-
মূল ধারণা: সামগ্রিকতা ও অংশগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক
-
গুরুত্বপূর্ণ নীতি: সাদৃশ্য, নৈকট্য ও ধারাবাহিকতা
6. তথ্য প্রক্রিয়াকরণ মডেল (Information Processing Model)
প্রজ্ঞামূলক বা জ্ঞানমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষের শিখনকে তথ্য গ্রহণ, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করার প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
কম্পিউটার যেভাবে তথ্য গ্রহণ করে, প্রক্রিয়াকরণ করে এবং ফল প্রকাশ করে, মানুষের শিখন প্রক্রিয়ার সঙ্গে তার কিছু সাদৃশ্য রয়েছে।
তথ্য প্রক্রিয়াকরণের প্রধান ধারণা
1. ইনপুট (Input): পরিবেশ থেকে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তথ্য গ্রহণ।
উদাহরণ: চোখ দিয়ে ছবি দেখা এবং কান দিয়ে শব্দ শোনা।
2. প্রক্রিয়াকরণ (Processing): সংগৃহীত তথ্যকে বুঝতে, বিশ্লেষণ করতে ও অর্থপূর্ণ করে তুলতে মানসিক প্রক্রিয়ার সাহায্য নেওয়া।
3. সংরক্ষণ (Storage): তথ্য স্মৃতিতে ধরে রাখা।
4. প্রতিক্রিয়া বা আউটপুট (Output): প্রক্রিয়াকৃত তথ্যের ভিত্তিতে উত্তর দেওয়া, কথা বলা, লেখা বা কোনো কাজ করা।
উদাহরণ
শিক্ষক একটি প্রশ্ন করলেন। শিক্ষার্থী প্রশ্নটি শুনল, তার অর্থ বুঝল, স্মৃতি থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য মনে করল এবং তারপর উত্তর দিল।
এই উদাহরণে প্রশ্ন শোনা হলো তথ্য গ্রহণ, প্রশ্ন বোঝা ও স্মৃতি থেকে তথ্য খুঁজে নেওয়া হলো প্রক্রিয়াকরণ, আর উত্তর দেওয়া হলো আউটপুট।
তথ্য প্রক্রিয়াকরণ মডেলের গুরুত্ব
-
শিক্ষার্থী কীভাবে তথ্য গ্রহণ করে তা বুঝতে সাহায্য করে।
-
স্মৃতি ও চিন্তার ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।
-
পূর্বজ্ঞান ব্যবহার করে নতুন বিষয় শেখার গুরুত্ব বোঝায়।
-
তথ্য বুঝে শেখার ওপর গুরুত্ব দেয়।
MCQ টিপস: Information Processing Model-এর সঙ্গে তথ্য গ্রহণ, প্রক্রিয়াকরণ, স্মৃতিতে সংরক্ষণ ও প্রতিক্রিয়ার ধারণাগুলি যুক্ত করে মনে রাখবে।
পরীক্ষার জন্য একনজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
| তত্ত্ব | প্রবক্তা | মূল ধারণা |
|---|---|---|
| সংযোজনবাদ বা চেষ্টা ও ভ্রান্তি তত্ত্ব | E. L. Thorndike | উদ্দীপক-প্রতিক্রিয়ার সংযোগ |
| প্রাচীন অনুবর্তন | Ivan Pavlov | উদ্দীপকের মধ্যে সংযোগ |
| সক্রিয় অনুবর্তন | B. F. Skinner | আচরণের ফল ও শক্তিদান |
| গেস্টাল্ট তত্ত্ব | Wertheimer, Koffka, Köhler | সামগ্রিকতা ও সংগঠন |
| তথ্য প্রক্রিয়াকরণ মডেল | প্রজ্ঞামূলক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সম্পর্কিত | তথ্য গ্রহণ, প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ |
TET ও CTET পরীক্ষার MCQ প্রস্তুতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
পরীক্ষার আগে নিচের বিষয়গুলি ভালোভাবে অনুশীলন করবে:
-
থর্নডাইকের 3টি প্রধান সূত্রের নাম ও উদাহরণ।
-
চেষ্টা ও ভ্রান্তি তত্ত্বের প্রবক্তা।
-
প্যাভলভের কুকুরের পরীক্ষা।
-
UCS, UCR, CS ও CR-এর অর্থ।
-
Classical Conditioning ও Operant Conditioning-এর পার্থক্য।
-
স্কিনারের Reinforcement, Punishment ও Shaping-এর ধারণা।
-
ধনাত্মক ও ঋণাত্মক শক্তিদানের পার্থক্য।
-
গেস্টাল্ট তত্ত্বের প্রবক্তা ও সংগঠনমূলক নীতি।
-
Information Processing Model-এর প্রধান ধাপ।
-
বিভিন্ন তত্ত্বের শিক্ষাগত তাৎপর্য।
এই বিষয়গুলি থেকে সংজ্ঞা, প্রবক্তা, উদাহরণ, পার্থক্য এবং শিক্ষাগত প্রয়োগভিত্তিক MCQ অনুশীলন করলে CDP অংশের প্রস্তুতি আরও সুসংগঠিত হবে।
